ঢাকেশ্বরী মন্দিরের জমি দখল: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঐতিহাসিক নথি
ব্রিকলেন নিউজ, ঢাকা:
রাজধানীর ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের জমি দখল নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সাম্প্রতিক একটি মন্তব্য ঘিরে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, মন্দিরের জমির একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগ দখল করে রেখেছিল। তবে সরকারি নথি, সিএস খতিয়ান এবং ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে মন্দির-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মন্ত্রীর এই দাবির সঙ্গে বাস্তব তথ্যের কোনো মিল নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি ও শ্মশান-বিতর্ক গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৯৬ সালে ভূমি মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি ঢাকেশ্বরী মন্দির এলাকা পরিদর্শন করেছিলেন। তাঁর ভাষ্যমতে, সে সময় প্রায় আড়াই একর জমি সরকারের হাতে ছিল, যা শ্মশান হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় কেউ দখল করতে পারেনি। বাকি সম্পত্তি আওয়ামী লীগের দখলে ছিল বলে তিনি দাবি করেন।
তবে মন্দির-সংশ্লিষ্টরা এই বক্তব্যকে ‘সত্যের অপলাপ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের সুস্পষ্ট দাবি, ঢাকেশ্বরী মন্দিরের জমিতে অতীতে কোনো শ্মশান ছিল না এবং বর্তমানেও নেই।
নথিপত্র ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট যা বলছে অনুসন্ধান ও সিএস খতিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের মোট জমির পরিমাণ ছিল ২০ বিঘা (আনুমানিক ৬.৬ একর)। এই জমির মালিকানা ও বেদখল হওয়ার ইতিহাস দীর্ঘ দশকের:
-
১৯৫৩ সালের অধিগ্রহণ: তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী হুকুম দখলের মাধ্যমে মন্দিরের ২.৫৬ একর জমি ‘মোমিন মটরস’-এর জন্য নিয়ে নেয়।
-
১৯৮২ সালের হস্তান্তর: তৎকালীন সরকার ওই ২.৫৬ একর জমির মধ্য থেকে ১.৭৫ একর জমি অবমুক্ত করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) হস্তান্তর করে। অবশিষ্ট জমি আর মন্দির কর্তৃপক্ষকে ফেরত দেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পাকিস্তান আমলে হুকুম দখলের মাধ্যমে হাতছাড়া হওয়া জমি আওয়ামী লীগ দখল করেছিল, এমন দাবি ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
জমি উদ্ধারের সাম্প্রতিক ইতিহাস ও বর্তমান চিত্র নথিপত্র বলছে, ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগে ‘আজম গং’-এর কবল থেকে প্রায় দেড় (১.৫) বিঘা জমি উদ্ধার করে ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। জানা যায়, ওই জমি উদ্ধারের প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট পক্ষকে সরকারের তরফ থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল।
বর্তমানে উদ্ধার হওয়া দেড় বিঘাসহ মোট প্রায় ৮ বিঘা জমি ঢাকেশ্বরী মন্দির কর্তৃপক্ষের দখলে রয়েছে। বাকি ১২ বিঘা জমি এখনো মোমিন মটরস, বুয়েট, নাভানা, ঘোষ এবং অ্যাডভোকেট মহসিনসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দখলে রয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৫৩ সালের হুকুম দখল, ১৯৮২ সালের জমি হস্তান্তর এবং ২০১৮ সালের জমি উদ্ধারের সরকারি নথিগুলো যাচাই করলে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের জমির প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অসত্য’ দাবি করে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। স্পর্শকাতর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জমির মতো বিষয়ে শীর্ষ পর্যায় থেকে মন্তব্য আসার আগে তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা এ ঘটনায় আবারও সামনে চলে এসেছে।