Skip to main content

Brick Lane News

সামরিক বাহিনীর অঘোষিত শাসন কীভাবে পাকিস্তানের আঞ্চলিক সংঘাতকে উসকে দিচ্ছে

সামরিক বাহিনীর অঘোষিত শাসন কীভাবে পাকিস্তানের আঞ্চলিক সংঘাতকে উসকে দিচ্ছে

অনুবাদ- ব্রিকলেন নিউজ, লন্ডন:

মূল লেখক: নবনীত খান তারিখ: ১২ আগস্ট ২০২৬

ভূমিকা: কাঠামোগত সংকট ও সামরিক হস্তক্ষেপ পাকিস্তানের বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখোয়া (কেপি) এবং পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের (পিওকে) তথাকথিত আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর (এজেকে) বর্তমানে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণের কারণেই মূলত এই ক্ষোভের জন্ম। কিন্তু সমস্যাগুলোর রাজনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে বেসামরিক সরকারগুলো ধীরে ধীরে সামরিক বাহিনীর হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছে। আর সামরিক বাহিনী এই দ্বন্দ্বগুলোকে স্রেফ ‘নিরাপত্তা হুমকি’ ও ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বৈধ রাজনৈতিক প্রতিবাদগুলোকে দমন করছে, যা রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার অবিশ্বাসের মাত্রাকে আরও গভীর করে তুলছে।

বেলুচিস্তানে দমন-পীড়ন ও হাইব্রিড শাসন বেলুচিস্তানে কয়েক দশক ধরে চলা বঞ্চনা ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও সশস্ত্র বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এর পাশাপাশি সাধারণ নাগরিক সমাজও বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ও সম্পদের অধিকার দাবি করে আসছে।

  • ২০২০ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদে মাহারং বালুচের নেতৃত্বে ‘বালোচ ইয়াকজেহতি কমিটি (বিওয়াইসি)’ গঠিত হয়।

  • ২০২৫ সালে মাহারং যখন গুম হওয়া ব্যক্তিদের (যেমন: বেবার্গ জেহরি, ড. হাম্মাল বালোচ) মুক্তির দাবি জানান, তখন উল্টো তাঁর বিরুদ্ধেই সন্ত্রাসবাদ ও রাষ্ট্রদ্রোহের মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়।

পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) ও পিএমএল-এন-এর সমন্বয়ে গঠিত বর্তমান ফেডারেল সরকারকে অনেকেই ‘হাইব্রিড সরকার’ বলে থাকেন, যেখানে মূল কলকাঠি নাড়ে সামরিক বাহিনী। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় সামরিক আধিপত্যের প্রমাণ মেলে যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের আত্মীয় ও সাবেক গণমাধ্যমকর্মী মহসিন নকভিকে বসানো হয়। এর আগে ইমরান খান বা নওয়াজ শরিফরা রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করলেও বর্তমান সামরিক নেতৃত্ব কঠোর হস্তে পরিস্থিতি মোকাবিলার নীতি গ্রহণ করেছে।

উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান: বাড়ছে সহিংসতা পাক ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজ (পিআইপিএস)-এর বার্ষিক নিরাপত্তা প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানে ২০২৩ সালে ৯৩ শতাংশ এবং ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ৯৫ শতাংশ বিদ্রোহী হামলার ঘটনা ঘটেছে কেবল বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায়।

  • বেলুচিস্তানে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর হামলার সংখ্যা ছিল ২০২২ সালে ৭৯টি, ২০২৩ সালে ১১০টি, ২০২৪ সালে ২০২টি এবং ২০২৫ সালে ২৩৪টি।

  • ২০২৫ সালের মোট ৪৩৫টি হামলার মধ্যে ৬৫ শতাংশেরও বেশি ক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু ছিল সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা।

আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি বনাম অভ্যন্তরীণ কঠোরতা পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের ‘অপারেশন সিন্দুর’ (পাকিস্তান যাকে ‘বুনিয়ান উন মারসুস’ বলে)-এর বিপরীতে জোরালো অবস্থান নিয়ে নিজের ক্ষমতা সুসংহত করেন। এমনকি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে তিনি সুনাম কুড়ানোরও চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দেশের ভেতরে সামরিক বাহিনী ‘হার্ড স্টেট’ বা কঠোর রাষ্ট্রীয় নীতি প্রয়োগ করছে। ২০২৪ সাল থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এবং তাঁর দল পিটিআই-এর সমর্থকরা এই সামরিক দমন-পীড়নের প্রধান শিকার।

খাইবার পাখতুনখোয়া: টিটিপি এবং পশতুন জাতীয়তাবাদ খাইবার পাখতুনখোয়ায় অনুন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে। সেখানে সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)। আফগান তালেবান টিটিপি-কে আশ্রয় দিচ্ছে—এমন অভিযোগে পাকিস্তান প্রায় ২৫ লাখ আফগান শরণার্থীকে জোরপূর্বক দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। মূলত আফগান তালেবানকে চাপে ফেলতেই এই কৌশল নেওয়া হয়। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সেনাবাহিনী টিটিপি দমনের অজুহাতে মূলত পশতুন তাহাফফুজ মুভমেন্টের (পিটিএম) মতো বৈধ পশতুন জাতীয়তাবাদী নেতাদের (যেমন: আলি উজির, মনজুর পশতুন) কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে।

পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর (PoK) ও গণবিক্ষোভ পিওকে-র তথাকথিত ‘আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর’-এ (এজেকে) ভারতের কাশ্মীর থেকে আসা শরণার্থীদের জন্য ১২টি আসন সংরক্ষণের বিরুদ্ধে তীব্র বিক্ষোভ চলছে। স্থানীয়দের দাবি, এই আসনগুলো মূলত ফেডারেল সরকারের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং স্থানীয় নেতাদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার হাতিয়ার।

  • ২০২৩ সালে গঠিত ‘জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি’ (জেএএসি) এই বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছে।

  • ২০২৬ সালের ৬ জুন, নির্বাচনের ঠিক আগে সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইনের আওতায় এই কমিটিকে নিষিদ্ধ করে পাকিস্তান সরকার।

উপসংহার: প্রশাসনিক পতন ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ২০২৬ সালের ১ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি খোদ স্বীকার করেন যে, পাকিস্তানের “সরকারি ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে” এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠন জরুরি। নকভির এই মন্তব্য মূলত সিন্ধু প্রদেশ থেকে করাচিকে আলাদা করার একটি প্রচ্ছন্ন সামরিক ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আন্তর্জাতিক মহলে যতই শান্তি প্রতিষ্ঠাকারীর ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা হোক না কেন, দেশের ভেতরে শান্তি না থাকলে তা কখনোই টেকসই হবে না। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা, আইএমএফ-এর ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ এবং জিডিপির ৬৮.৫ শতাংশ ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পাকিস্তানের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি প্রকৃত রাজনৈতিক নেতৃত্ব। সামরিক শক্তি প্রয়োগের বদলে রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমেই কেবল এই গভীর আঞ্চলিক সংঘাতের অবসান ঘটানো সম্ভব।

(মূল প্রবন্ধটি নয়াদিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার এমএমএজে একাডেমি অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের পিএইচডি গবেষক নবনীত খানের। মতবাদটি একান্তই লেখকের নিজস্ব।)