দেশে প্রতি বছর ১ জানুয়ারি কয়েক কোটি শিক্ষার্থীর মধ্যে একযোগে নতুন বই বিতরণ করা হয়। এই কার্যক্রমকে এবার গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
এ লক্ষ্যে ‘লার্জেস্ট অ্যানুয়াল টেক্সটবুক ডিস্ট্রিবিউশন প্রোগ্রাম’ শীর্ষক একটি বিশেষ উদ্যোগের অনুমোদন চেয়ে ইতোমধ্যেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন মিললেই আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর মাঝে ৩৩ কোটি নতুন বই বিতরণ করা হবে। এই কর্মসূচিকেই গিনেস রেকর্ডের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এনসিটিবির চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী স্বাক্ষরিত চিঠিতে উদ্যোগটির বিভিন্ন দিক বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
এতে বলা হয়, আগে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে বছরের প্রথম দিনে শতভাগ বই পৌঁছানো সম্ভব হতো না। তবে বর্তমান সরকারের সঠিক পরিকল্পনা ও নিবিড় মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এখন ১ জানুয়ারিতেই এই বিপুল পরিমাণ বই বিতরণ নিশ্চিত করা সম্ভব।
এনসিটিবি সচিব অধ্যাপক শাহ মুহাম্মদ ফিরোজ আল ফেরদৌস বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো বিশ্বের আর কোনো দেশে সরকারিভাবে এত বিপুল পরিমাণ বই বিতরণ করা হয় না। আমরা এই বিষয়টির একটা বৈশ্বিক স্বীকৃতি আদায় করতে চাই। যেটি বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও সফলতার একটি স্মারক হয়ে থাকবে।’
গিনেস কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী, পুরো প্রক্রিয়া সফল করতে এনসিটিবিতে একটি বিশেষ গিনেস রেকর্ড সেল গঠন, তথ্য সংগ্রহের জন্য অডিট ফার্ম নিয়োগ এবং মাঠ পর্যায়ের তথ্য পদ্ধতিগতভাবে সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ রাখতে আন্তর্জাতিক অডিটর বা ভেরিফায়ার নিয়োগেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
চার ধাপের কর্মপরিকল্পনা
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুরো প্রক্রিয়া চারটি ধাপে সম্পন্ন হবে। প্রথম ধাপের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে মে থেকে জুনের মধ্যে। এ সময়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং এনসিটিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত হবে বিশেষ ‘গিনেস রেকর্ড সেল’। একই সঙ্গে গিনেস পোর্টালে এনসিটিবির প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাকাউন্ট খোলা এবং পূর্ববর্তী বছরের অডিট করা তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
দ্বিতীয় ধাপ জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত। এ সময়ে নির্দিষ্ট রেকর্ড ক্যাটাগরির জন্য গিনেস কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দেওয়া হবে। তথ্যের সত্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়োগ পাবে একটি আন্তর্জাতিক অডিট ফার্ম।
তৃতীয় ধাপ সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ সময়ে মাঠ পর্যায়ের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ ও নথিবদ্ধ করার কাজ চলবে। মুদ্রণখানা থেকে শুরু করে উপজেলা ও বিদ্যালয় পর্যন্ত বই পৌঁছানোর প্রতিটি ধাপ ডিজিটাল পদ্ধতিতে ট্র্যাক করা হবে। উচ্চমানের ভিডিও ফুটেজ, সময়-সংবলিত স্থিরচিত্র এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাক্ষ্য সংগ্রহ করে তৈরি করা হবে শক্তিশালী প্রমাণপত্র।
চতুর্থ ও চূড়ান্ত ধাপ ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি। এদিন বই উৎসবে অংশ নিতে গিনেসের একজন অফিসিয়াল অ্যাডজুডিকেটর বা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষককে আমন্ত্রণ জানানো হবে। তিনি বিভিন্ন জেলায় সরাসরি মাঠ পর্যায়ের বিতরণ কার্যক্রম এবং রিয়েল-টাইম ডেটা পর্যবেক্ষণ করবেন। যাচাই সম্পন্ন হলে ওই দিনই উৎসবের মঞ্চে আনুষ্ঠানিকভাবে সনদ প্রদান করা হবে।
অনুমোদনের অপেক্ষা
এনসিটিবি সচিব শাহ মুহাম্মদ ফিরোজ আল ফেরদৌস এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এই উদ্যোগের বিষয়ে আমাদের চেয়ারম্যান শিক্ষা সচিবের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। চেয়ারম্যানের মাধ্যমে আমরা একটি আবেদনপত্র পাঠিয়েছি। সেখান থেকে অনুমোদন পেলে কাজ শুরু হবে। এই প্রক্রিয়ার জন্য প্রচুর নথিপত্র বা ডকুমেন্টের প্রয়োজন হয়। বর্তমান ও পূর্ববর্তী বছরের যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ ধারাবাহিকভাবে গিনেস কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হবে।’
তিনি বলেন, যথাযথ অনুমোদন সাপেক্ষে ১ জানুয়ারি বই উৎসবের দিনে গিনেসের প্রতিনিধি বা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে বিশ্ব রেকর্ড উদযাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। রেকর্ড অর্জিত হলে তা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সক্ষমতার স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হবে।