জীবন, সাহিত্য ও সংগ্রামের সংলাপ
জুয়েল রাজ –
ময়নূর রহমান বাবুল ,আমাদের কাছে প্রিয় বাবুল ভাই, নানা পরিচয়ে পরিচিত তিনি, আমার কাছে বিলেতের প্রগতিশীল অংশের এক সেনাপতি । তাঁর জীবন ও কার্যক্রম নিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থ “এক জীবনে বহু উচ্চারণ : ময়নূর রহমান বাবুল ” আমি হাতে পাওয়ার আগেই, বাংলাদেশে প্রচ্ছদ দেখি প্রকাশক ও লেখকের বদান্যতায় । এবং নামটি আমার খুবই পছন্দ হয়।
সেই বইটি বাবুল ভাই আমাকে লন্ডনে হাতে তুলে দেন ২৫ মার্চ তারিখে, ৭১ এর কালোরাতের গণহত্যার শহীদ স্মরণে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সমাবেশে।
বই পড়ার অভ্যাস গত হয়েছে অনলাইনের অসভ্য অভ্যাসে ।কিন্ত বাবুল ভাইকে নিয়ে লেখা বইটি পড়ার লোভ সংবরণ করা সম্ভব হয়নি। পড়া শুরু করার আগে ভূমিকা ও কয়েকটি পৃষ্ঠা উল্টাতেই চোখে পরে কুরুয়া হেমন্তী সাংস্কৃতিক সংঘ-কুহেসাস প্রসঙ।
আমার ছেলেবেলার কৈশোরের খুবই পরিচিত একটি নাম। কারণ সেই সময় বাড়ি থেকে সিলেট আসতে শেরপুর থেকে বাসে উঠতাম আর রাস্তায় চোখে পড়ত “কুহেসাস” এর ব্যনার পোস্টার , তখন জানতাম না এই কুহেসাস বিষয়টা আসলে কি। আবার খুবই কৌতুহল ছিল। যখন পত্রিকা পড়া শুরু করি তখন জানিলাম এই কুহেসাস হলো কুরুয়া হেমন্তী সাংস্কৃতিক সংঘ। যার পুরোধা ছিলেন ময়নূর রহমান বাবুল। এই তথ্যটি বাবুল ভাই ও কোনদিন বলেন নি। সাহিত্য সংগঠন হিসাবে পুরো সিলেট অঞ্চলে এক ব্যাপক ভূমিকা ছিল সংগঠনটির । বাবুল ভাইয়ের ব্যাক্তিগত সম্পর্ক ও যোগাযোগের মাধ্যমে সান্নিধ্য পেয়েছিলাম মহামতি অমর্ত্য সেনের।
আমার সেই দ্রুতপাঠের আলোকে ক্ষুদ্র একটি প্রতিক্রিয়া –
কিছু বই আছে, যা পড়ার আগে একজন মানুষকে আমরা যেমনভাবে চিনে থাকি, পড়া শেষে তাকে আর সেই একই জায়গায় দেখতে পারি না। এক জীবন বহুউচ্চারণ: ময়নূর রহমান বাবুল আমার কাছে তেমনই একটি বই।
ময়নূর রহমান বাবুলকে আমি আগে থেকেই চিনতাম—সংগঠনের কাজের সূত্রে। কাছ থেকে তাঁর নেতৃত্ব দেখেছি, তাঁর কাজের ধরণ, মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দৃঢ়তা—এসবের সঙ্গে পরিচয় ছিল। কিন্তু এই বইটি পড়ার পর আমি যেন নতুন করে আরেকজন বাবুলকে আবিষ্কার করি। সেই আবিষ্কার শুধু একজন ব্যক্তিকে নতুনভাবে চেনা নয়; বরং একটি জীবনদর্শন, একটি সময় এবং একটি সংগ্রামী চেতনার ভেতরে প্রবেশ করার অভিজ্ঞতা।
মিহিরকান্তি চৌধুরী এই গ্রন্থে কোনো একমুখী প্রশংসা করেননি। তিনি নির্মাণ করেছেন এমন একটি বিশ্লেষণধর্মী পাঠ, যেখানে ব্যক্তি, সাহিত্য এবং সমাজ—তিনটি স্তর একসঙ্গে কথোপকথনে যুক্ত হয়েছে।
ব্যক্তি নয়, একটি ধারার প্রতিচ্ছবি
এই বইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এখানে ময়নূর রহমান বাবুলকে কোনো একক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা হয়নি। তিনি যেমন কবি, তেমনি সংগঠক, রাজনৈতিক কর্মী, প্রাবন্ধিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী।
আমি যাকে একজন সংগঠক হিসেবে দেখেছি, বইটি তাকে একটি বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরে—একটি চলমান চেতনা হিসেবে। এখানে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সামষ্টিক দায় একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে।
লেখক দেখিয়েছেন, বাবুলের জীবন আসলে এক ধারাবাহিক সংগ্রাম—নিজের ভেতরের দ্বিধা, সমাজের বৈষম্য এবং সময়ের অন্যায়ের বিরুদ্ধে।
শৈশব ও শিকড়: মানস গঠনের ভিত
গ্রন্থে তাঁর শৈশব ও পারিবারিক পরিবেশের যে বিশ্লেষণ এসেছে, তা আমাকে বিশেষভাবে ভাবিয়েছে। গ্রামীণ বাস্তবতা, প্রকৃতির সংস্পর্শ, ধর্মীয় অনুশাসন এবং পারিবারিক মূল্যবোধ—এই সবকিছু মিলেই গড়ে উঠেছে তাঁর মানসিক ভিত্তি।
আমি যাকে একজন দৃঢ় সংগঠক হিসেবে দেখেছি, বইটি দেখায় সেই দৃঢ়তার শিকড় কোথায়।
এখানে শৈশব কোনো স্মৃতিচারণ নয়; বরং ভবিষ্যতের সংগ্রামী মানুষ হয়ে ওঠার প্রস্তুতির সময়।
সাহিত্যের ভেতর দিয়ে জীবনের উচ্চারণ
বাবুলের সাহিত্য নিয়ে আলোচনাই এই বইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশগুলোর একটি। তাঁর কবিতা, গল্প, ছড়া ও প্রবন্ধ—সবকিছুর ভেতরেই একটি স্পষ্ট মানবিক অবস্থান আছে।
আমি আগে তাঁর সংগঠক সত্তাটাকেই বেশি দেখেছি; কিন্তু এই বই আমাকে তাঁর সাহিত্যিক গভীরতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
তাঁর কবিতা বিমূর্ত সৌন্দর্যের নয়; বরং শ্রমজীবী মানুষের ক্লান্তি, নিপীড়ন এবং প্রতিরোধের ভাষা। গল্পে তিনি তুলে আনেন সেইসব মানুষকে, যারা মূলধারার বাইরে থেকেও বাস্তবতার কেন্দ্র বহন করে।
লেখক যথার্থই দেখিয়েছেন, তাঁর ভাষা সংযত—এবং এই সংযমই তাঁর শক্তি। পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে।
সংগঠক বাবুল: কাছ থেকে দেখা এবং নতুন করে চেনা
সংগঠনের কাজের সূত্রে আমি বাবুলকে যেভাবে দেখেছি, বইটি সেই অভিজ্ঞতাকে আরও বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে দাঁড় করায়।
আমি দেখেছি তাঁর নেতৃত্ব, মানুষকে একত্র করার ক্ষমতা, দৃঢ়তা—কিন্তু এই গ্রন্থ দেখায়, এই নেতৃত্বের পেছনে কী ধরনের চিন্তা, দায়বোধ এবং আদর্শ কাজ করে।
বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে তিনি যে বিকল্প সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করেছেন, তা কেবল কার্যক্রম নয়; বরং একটি চেতনা নির্মাণের প্রক্রিয়া।
সংগঠন তাঁর কাছে ছিল সচেতনতা তৈরির জায়গা—মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জাগানো।
প্রবাসজীবনের প্রসঙ্গটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দূরত্ব সত্ত্বেও তিনি ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিজের সম্পর্ক অটুট রেখেছেন। এই জায়গায় তিনি হয়ে ওঠেন এক ধরনের সেতুবন্ধনকারী।
রাজনীতি ও মানবিক দায়
গ্রন্থে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকার আলোচনা এসেছে ভিন্নভাবে। এখানে রাজনীতি কোনো ক্ষমতার কাঠামো নয়; বরং একটি মানবিক দায়বোধের প্রকাশ।
ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর চিন্তা ও সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছে।
লেখক তাঁকে কোনো মতাদর্শের মুখপাত্র হিসেবে নয়, বরং একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে দেখিয়েছেন—যা এই বইয়ের অন্যতম শক্তি।
লেখক হিসেবে মিহিরকান্তি চৌধুরীর কৃতিত্ব
এই গ্রন্থের আরেকটি বড় দিক হলো এর লেখনভঙ্গি। মিহিরকান্তি চৌধুরী প্রশংসা ও বিশ্লেষণের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রেখেছেন।
তিনি আবেগে ভেসে যাননি, আবার শুষ্ক একাডেমিক ভঙ্গিতেও লেখেননি। ফলে বইটি একইসঙ্গে গবেষণাধর্মী এবং পাঠযোগ্য।
একটি সময়ের সাংস্কৃতিক দলিল
সবশেষে, এই বইটি একটি সময়ের দলিল। এখানে উঠে এসেছে ছাত্র আন্দোলন, বাম রাজনৈতিক ধারা, সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, প্রবাসজীবনের টানাপোড়েন এবং সমাজের দ্বন্দ্ব।
ফলে এটি শুধু একজন মানুষকে জানার বই নয়; বরং একটি সময়কে বোঝার উপায়।
উপসংহার
এক জীবন বহুউচ্চারণ: ময়নূর রহমান বাবুল আমার কাছে একটি নতুন আবিষ্কারের বই।
যাকে আমি আগে কাছ থেকে দেখেছি, এই বই আমাকে তাকে নতুনভাবে চিনতে শিখিয়েছে।
এখানে ময়নূর রহমান বাবুল শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থানের প্রতীক। আর মিহিরকান্তি চৌধুরী সেই অবস্থানকে তুলে ধরেছেন যুক্তি, সংবেদনশীলতা এবং গভীর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে।
এই বই পড়া মানে শুধু একটি জীবন জানা নয়—বরং নিজের সময়কে নতুন করে দেখা এবং প্রশ্ন করার সাহস অর্জন করা। সেই অর্থে এটি একটি প্রয়োজনীয় এবং দীর্ঘস্থায়ী গুরুত্ব বহনকারী গ্রন্থ।
লেখক – কবি, সাংবাদিক
সম্পাদক ,প্রকাশক
ব্রিকলেন নিউজ – bricklanenews.com – Brick Lane News




