নারী দিবসেই পঞ্চগড় জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামানের কাছে লাঞ্ছিত হওয়ার অভিযোগ করেছেন তার অফিসের নারী কর্মীরা। গায়ে হাত তোলাসহ নানা অভিযোগ উঠেছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগিরা জানান, রোববার (৮ মার্চ) নারী কর্মীদের নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নারী দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যান জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের প্রশিক্ষক লুনা বেগম। একটু দেরি হওয়ায় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের দোতলায় নারী কর্মীদের গালাগালি করেন ওয়াহিদুজ্জামান। এমনকি লুনার গায়ে হাত তোলেন ওই কর্মকর্তারা।
বিষয়টি তারা নারী দিবসের আলোচনাতেও উত্থাপন করন। এমনকি জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করেন। পরে তারা নিজ কার্যালয়ে প্রতিবাদ করলে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে।
ভুক্তভোগী প্রশিক্ষক লুনা বেগম বলেন, আমরা দীর্ঘদিন এই কর্মকর্তার দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছি। অসভ্য ভাষায় আমাদের গালিগালাজ করেন তিনি। তারপরও জীবিকার জন্য নীরবে সব সহ্য করেছি। আজ নারী দিবসে সবার সামনে তিনি আমার গায়ে হাত তুলেছেন। সকল নারী কর্মীদের অসভ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন। এটা মেনে নেওয়া যায় না।
অফিসের হিসাবরক্ষক সিলভিয়া নাসরিন বলেন, ‘তিনি (ওয়াহিদুজ্জামান) আমার স্বামীর মাধ্যমে বিএনপি মহাসচিবকে বলে বদলি ঠেকাতে প্রস্তাব দেন। কিন্তু আমার স্বামী সেই কাজ না করায় আমাকে কোনো কারণ ছাড়াই গালিগালাজ শুরু করেন। প্রতিদিন অফিসে এসে দুর্ব্যবহার করেন। তার জিহ্বায় ঘা হয়েছে, সেখানে আমাকে মলম লাগিয়ে দিতে বলেন। আমরা এই অফিসার থেকে মুক্তি চাই। হয় আমাদের অন্যত্র বদলি করে দিন, না হলে এই অফিসার থেকে আমাদের রক্ষা করুন।’
অফিসের ঝাড়ুদার সালমা বেগম বলেন, ‘আমরা ছোট পদে চাকরি করি। অল্প টাকা বেতন পাই। কিন্তু ওই অফিসার আমাদের সঙ্গে যে ব্যবহার করেন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। কিছু হলেই লাথি দিতে এগিয়ে আসেন। এর আগে আমাকে লাথিও মেরেছেন।’
ওই অফিসের কর্মচারী বৃদ্ধ মকবুল হোসেন বলেন, আমাকে সময়মত নামাজে যেতেও বাধা দেন এই অফিসার। কায়েকবার আমার গায়ে গাত তুলেছেন তিনি।
পঞ্চগড়ের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক সুমন চন্দ্র দাশ বলেন, ভুক্তভোগী নারীরা আমার কাছে অভিযোগ করেছেন। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছি।
অভিযোগ অস্বীকার করে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক (অ. দা.) এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘সব মিথ্যে। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।’
নারী কর্মীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ ছাড়াও এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে। অফিসের কর্মীরা বলেন, ওয়াহিদুজ্জামানের বদলি আদেশের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও অদৃশ্য ক্ষমতার বলয়ে এখনও চারটি অফিসে রাজত্ব করছেন। অফিসের অনুষ্ঠানে ডিম, বিস্কুট ও কলা দিয়ে ২০০ প্যাকেট বিরানির বিল করা, পাঁচটি চেয়ার কিনে দ্বিগুণ বিল করাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন আল্লাহ ও হযরত মুহাম্মদকে (সা.) নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে। এরই মধ্যে নারী দিবসে অফিসের নারী কর্মীর গায়ে হাত তুলে নতুন করে আলোচনায় ওয়াহিদুজ্জামান।
ভুক্তভোগী নারীরা জানান, এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান ২০২০ সালে বোদা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার পদে যোগদান করেন। এরপর বোদা উপজেলার পাশাপাশি দেবীগঞ্জ ও পঞ্চগড় সদর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা এবং জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালকের পদে অতিরিক্ত পান। চার অফিসের দায়িত্বে থাকায় ওয়াহিদুজ্জামান বনে যান জেলা মহিলা বিষয়ক অফিসের সম্রাট। চারটি অফিসে গড়ে তোলেন অনিয়ম আর দুর্নীতির রাজত্ব। তার কথা না শুনলেই আক্রোশের মুখে পড়তে হয় অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। অফিসের কর্মী থেকে শুরু করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি- তার দুর্ব্যবহার থেকে বাদ যাননি কেউ।
২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ওয়াহিদুজ্জামানকে পঞ্চগড় থেকে চাপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে বদলি করা হয়। কিন্তু বদলি আদেশের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও অদৃশ্য ক্ষমতাবলে চারটি অফিসেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তিনি।





