Brick Lane News

ভালোবাসার খোঁজে সীমান্ত পেরিয়ে কারাগারে, সাজা শেষে দেশে ফিরলেন ভারতীয় নারী

প্রকাশিত: ৯ মার্চ, ২০২৬ ২:৫০ পিএম

প্রথম স্বামী ও সন্তানকে খুজে পাওয়ার আশায় বৈধ পাসপোর্ট-ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন ভারতের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁ এলাকার বাসিন্দা ফাল্গুনী রায় (২৯)। কিন্তু সেই খোঁজই শেষ পর্যন্ত তাকে ঠেলে দেয় বিপদ, প্রতারণা ও কারাবাসের কঠিন বাস্তবতায়। অবশেষে দীর্ঘ আট মাস কারাভোগ ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে রোববার (৮ মার্চ) আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিন নিজ দেশে ফিরতে পেরেছেন তিনি।

জানা গেছে, প্রায় ১০ থেকে ১১ বছর আগে বাংলাদেশের পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি উপজেলার বাসিন্দা গৌরাঙ্গ সরকার পরিচয় গোপন করে ভারতে যান এবং সেখানে ফাল্গুনী রায়কে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তাদের সংসারে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। কয়েক বছর স্বাভাবিকভাবে সংসার চললেও প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বছর পর গৌরাঙ্গ হঠাৎ করে ছেলেকে নিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন এবং স্ত্রীর সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। স্বামী ও সন্তানের খোঁজে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও কোনো খবর না পেয়ে ফাল্গুনী পরে প্রতিবেশী প্রসেনজিতের সঙ্গে নতুন করে সংসার শুরু করেন।

তবে প্রথম স্বামী ও সন্তানকে অন্তত একবার দেখার আকাঙ্ক্ষা তার মনে থেকেই যায়। সেই টান থেকেই ২০২৫ সালের জুন মাসে বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে আসেন তিনি। বাংলাদেশে এসে পিরোজপুরের স্বরূপকাঠিতে স্বামীর বাড়িতে পৌছালে পরিস্থিতি তার জন্য আরও কঠিন হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয় এবং তাকে অপমান করা হয়। এমনকি তার পাসপোর্ট ও অন্যান্য কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া হয় এবং মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।

অসহায় অবস্থায় পড়ে ফাল্গুনী শেষ পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় তিনি দালালের সহায়তায় ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে ফেরার চেষ্টা করেন। কিন্তু ২০২৫ সালের ৩০ জুন মহেশপুর সীমান্তে প্রবেশের সময় মহেশপুর ব্যাটালিয়ন (৫৮ বিজিবি)-এর সদস্যদের হাতে আটক হন তিনি। পরে তাকে মহেশপুর থানায় সোপর্দ করা হয়। আদালত দুইটি পৃথক মামলায় তাকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করেন। সেই সাজা ভোগ করতে গিয়ে ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা জেলা কারাগারে প্রায় আট মাস কাটাতে হয় ফাল্গুনীকে।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক জটিলতা এবং দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর অবশেষে তার নিজ দেশে ফেরার পথ সুগম হয়। এ সময় তার দেশে ফেরার প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ অ্যামেচার রেডিও অ্যাসোসিয়েশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা জয়নগর সীমান্তের শূন্যরেখায় আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে ভারতের অভিবাসন পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দর্শনা ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যদের উপস্থিতিতে এই হস্তান্তর কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।

দর্শনা ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের উপ-পরিদর্শক (এসআই) তুহিন জানান, ফাল্গুনী রায় ভারতের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁ থানার টেংরা কলোনি এলাকার মৃত বিশ্বনাথ রায়ের মেয়ে। দীর্ঘ আট মাস সাজাভোগ শেষে বিজিবি ও বিএসএফের পতাকা বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

হস্তান্তরের সময় বিজিবির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন, দর্শনা ক্যাম্পের সুবেদার মো. এনামুল হক এবং ভারতের বিএসএফের পক্ষে গেদে ক্যাম্পের সহকারী কমান্ড্যান্ট রাজেশ কুমার।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিন ফাল্গুনীর এই ঘরে ফেরা যেন প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় এক নারীর সংগ্রাম, প্রতারণা ও সীমান্তের কঠিন বাস্তবতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্পের যেখানে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেলেন তিনি।

Related Posts

সর্বশেষ খবর

অন্যান্য ক্যাটাগরি