সম্পাদক ও প্রকাশক – ব্রিকলেন
১- যুক্তরাজ্যে স্থায়ী নাগরিক বা ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী ছাড়া যারা ওয়ার্ক পারমিট বা অন্যান্য ভিসায় দেশটিতে বসবাস করেন, তাদের আগে একটি বায়োমেট্রিক রেসিডেন্স কার্ড (BRP) দেওয়া হতো। এই কার্ডটি ছিল দেশটিতে বসবাসের বৈধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণপত্র। ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে এবং ২০২৬ সাল থেকে ধীরে ধীরে সেই কার্ডের পরিবর্তে যুক্তরাজ্য সরকার চালু করেছে ডিজিটাল ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস, যেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে একটি শেয়ার কোড। এখন আর কোথাও কার্ড প্রদর্শনের প্রয়োজন হয় না। নির্দিষ্ট একটি শেয়ার কোড দেখালেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ইমিগ্রেশন তথ্য সরকারি ওয়েবসাইটে ছবি সহ দেখা যায়।
কিন্তু এই নতুন ব্যবস্থাই বাংলাদেশের বিমানবন্দরে অনেক প্রবাসী যাত্রীর জন্য নতুন ধরনের বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।কারণ যখনই যুক্তরাজ্যের কোন যাত্রী লাগেজ ব্যাগেজ সহ পরিবার পরিজনকে বিদায় জানিয়ে বোডিং পাসের জন্য লাইনে দাঁড়ান তখনই শেয়ার কোডটি দেখতে চাওয়া হয় এবং এটাই নিয়ম। প্রবাসী যাত্রীরা সেই শেয়ার কোডের ছবিটা দেখান অথবা মুখে বলেন।কিন্ত কর্মকর্তা যখন সেই কোডটি লাইভ দেখাতে বলেন ,মানে সেই যাত্রীকে সেই মুহুর্তে তার একাউন্টে লগ ইন করে দেখাতে বলা হয়।
প্রথমত অনেক যাত্রী থাকেন যাদের আইটি দক্ষতা নেই। অনেকের আছে বাংলাদেশি সিম কার্ড নেই মোবাইলে ,সেই ক্ষেত্রে তার পক্ষে লগিন করার সুযোগ নেই ,অথবা বাংলাদেশি সিম ,মোবাইল সবই আছে কিন্ত নেটওয়ার্ক এর কারণে লগিন করতে পারে না। গত ৫ মার্চ ঢাকা লন্ডন ফ্লাইটে সেই বিড়ম্বনার স্বাক্ষী ছিলাম আমি নিজে । আমার সামনেই ছিলেন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক , পাশের লাইনে ছিলেন এক তরুণ আইনজীবী এবং পিছনে এক বয়স্ক ভদ্রলোক ,যিনি বাসা থেকে লিংক সহ কাগজটি প্রিন্ট করে নিয়ে এসেছেন। কিন্ত সামনে দাঁড়ানো কর্মকর্তাটি বারবার লাইভ কোড চাইছিলেন । এবং এই যাত্রীদের কেউ নেট ওয়ার্ক এর অভাবে কেউ আইটি দক্ষতার অভাবে সেটি পারছিলেন না। এবং অতীতে কখনো এই কোডটি লাইভ দেখতে চাওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন। কিন্ত টেবিলের অন্যপাশের কর্মকর্তারা ছিলেন অনঢ়। যাত্রীরা বলছিলেন এটি আপনাদের দায়িত্ব ,আপনারা চেক করে দেখুন আমার দেয়া তথ্য বা কোড ভুল না সঠিক। যদিও দীর্ঘ বাকবিতন্ডার পর উনারা করুণা করে ,যাত্রীদের সাহায্য করছেন বলে সেই যাত্রা উদ্ধার করে দিলেন ।
“কিন্ত বাস্তবতা হচ্ছে এই শেয়ার কোড যাচাইয়ের নিয়ম হচ্ছে যাচাইকারী কর্মকর্তার ।”
এখানেই শেষ নয়, দ্বিতীয়বার বিমানে উঠার মুখে ও সেই কোড যাচাই করা হয়। লাইনে দাঁড়ানো চার জনের সাথে কথা বলে জানলাম সবাই এর ভুক্তভোগী । আমি ও আমার এক বন্ধু এক সাথে ফিরব বলে লাগেজ নিয়ে দাঁড়ালাম একজনের লাগেজ ওজন কয়েক কেজি বেশি, অন্যজনের লাগেজের ওজন আবার কম । দুইটা লাগেজ একসাথে ওজন করার অনুরোধ করলে ও কর্মকর্তা সেটি নাকচ করে দেন । তার সামনেই আমরা এক লাগেজ থেকে অন্য লাগেজে কিছু কাপড় চোপড় অদল বদল করলাম ,তারপর তিনি লাগেজ ছাড়েন । এতে করে দীর্ঘ লাইনে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় নষ্ট হয়। আমরা যেহেতু লাইনে ছিলাম তখন তিনি অন্যযাত্রীকে ও সেবা দিতে পারছিলেন না। আবার একই জিনিস গত মাসে ভারতে আবার ভীন্ন অভিজ্ঞতা ছিল। বড় একটি গ্রুপের একজনের লাগেজের ওজন বেশী হওয়াতে ,দায়িত্ব্ররত কর্মকর্তা বললেন আপনাদের সবার লাগেজ এক সাথে দিয়ে দেন তাতে করে ব্যালেন্স হয়ে যেতে পারে , এবং নিজ উদ্যেগেই তিনি সেটি করলেন। প্রবাসী হেল্প ডেস্কের কর্মচারীরা দেখলাম বেশ সচল আছেন ,কি কাজ জানি না তবে তাদের সক্রিয়তা চোখে পড়েছে।
২- একই অবস্থা বিমানের টিকেটের গত মাসের ২২ তারিখ আমি বাংলাদেশ বিমানে লন্ডন থেকে সিলেট যাই , সেই টিকেট আমি বাংলাদেশ থেকে ভোর রাতে কনফার্ম করি, মানে বাংলাদেশে তখন ২২ তারিখ সকাল ১০ টা প্রায় , লন্ডন সময় তখন ভোর । কিন্ত এর আগে অনলাইনে বা থার্ড পার্টি ওয়েবসাইট গুলোতে বিমানের কোন টিকেট ছিল না। কিন্ত ম্যাজিকের মত বাংলাদেশের এক ট্রাভেল ব্যবসায়ী আমাকে টিকেট টি সংগ্রহ করে দিলেন । যদিও মধ্যপ্রাচ্যের এয়ারলাইনসের চেয়ে দাম ছিল বেশী। কিন্ত অবাক করার বিষয় হল ,বিমানে উঠে দেখি অর্ধেক বিমানই খালি। পিছনের পুরো ব্লক শূন্য ছিল একজন যাত্রী ও ছিল না । বাকী সিটে ও অনেকেই শুয়ে ঘুমিয়ে গেছেন অথচ বিমানের টিকেটের ক্রাইসিস সব সময় লেগেই থাকে । আর দাম থাকে আকাশচুম্বী ,চাইলেও অনেকে এই উচ্চমূল্যের কারণে বিমানে ভ্রমণের লোভ সংবরণ করতে বাধ্য হন। নিজের সাধ্যের মধ্যে অন্য এয়ারলাইনসের সেবা গ্রহণ করেন। বিমানের এই স্বেচ্ছাচারিতায় নিয়ে দশকের পর দশক ধরে আলোচনা হচ্ছে কিন্ত ,বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধা যায়নি ।
“বিমানের সেবার মান নিয়ে ও একই কথা প্রযোজ্য । বিমানের ক্রুদের ব্যবহার এখনো আন্তর্জাতিক মানের হতে পারেনি। একেক জন ক্রু একেক ধরণের পোষাক পরেন, বিরানী ভাতই একমাত্র খাবার।”
আসার সময় আমার পাশে বসা বিদেশী নাগরিক একবার খাবার নিয়েছিল, নিয়ে না খেতে পেড়ে ,পরে আর দুইবার মানা করে দিয়েছে। খাবার ঢাকার জন্য ব্যবহার করা হয় ক্লিন ফিল্ম , সোজা বাংলায় বললে স্বচ্ছ পলিথিন। যেখানে অন্যান্য এয়ারলাইনস গুলো ,যারা প্রায় অর্ধেক পয়সায় টিকেট বিক্রি করে ,তারা প্লাস্টিক কাভার ব্যবহার করে । খাবার মান ও পেশাদারীত্বের জায়গায় শতগুণ এগিয়ে।ফ্লাইট অবতরণের এক ঘন্টা আগেই ,হেডফোন ,কম্বল নেয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগা যায়। একেক জন যাত্রী দুইবার তিনবার করে হেড ফোন বদল করতে হয় , কারন হেডফোনগুলো ঠিকমত কাজ করে না। সবচেয়ে বড় কথা নির্ধারিত ফ্লাইট ২ ঘণ্টা পরে উড্ডয়ন করেছে কারণ , ত্রুটির জন্য বিমানের দরজা লাগানো সম্ভব হচ্ছিল না। ইঞ্জিনিয়ার এসে ঠিক করে দেয়ার পর বিমান ফ্লাইট করে। কিন্ত যাত্রীদের মধ্যে এক ধরণের উদ্বেগ বা ভীতি ছিল সার্বক্ষণিক ।
৩- গত দুই দিন আগে বর্তমান বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জনাব হুমায়ুন কবির লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে নেমে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত হাইকমিশনার আবিদা ইসলামের প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। ঘোষণাকালে পররাষ্ট্র উপদেষ্ঠার (প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা) পাশেই ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। পররাষ্ট্র উপদেষ্টার ঘোষণার পরদিন ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, হাইকমিশনার আবিদা ইসলামসহ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করে ঢাকায় বদলি করা হয়েছে। সরকার যেকোনো সময় যেকোনো মিশন থেকে যে কাউকে প্রত্যাহার করতে পারে। কিন্তু লন্ডনের হাই কমিশনার প্রত্যাহারের ঘোষণা যেভাবে গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। তা খুবই আপত্তিজনক। সরকার পরিবর্তন হলে সরকারের পছন্দসই লোকজন দেশে বিদেশে বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে নিয়োগ পাবেন এটা দোষের কিছু নয়। কিন্তু কাকে কোন প্রক্রিয়ায় সরানো হচ্ছে তার সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি জড়িত থাকে।
বাস্তবতা হল , একজন হাই কমিশনার দেশের হয়ে কি কাজ করেন , সাধারণ প্রবাসীদের ৮০ ভাগ মানুষই জানেন না। বাকী ২০ ভাগ ,ব্যবসায়ী ,রাজনীতিবিদ ,সাংবাদিক সুশীল সমাজ হাই কমিশনের নানা বিষয়ে সম্পৃক্ত থাকেন । তাও সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে সেই তালিকা বদলে যায় । সাধারণ মানুষ বুঝেন তাদের পাসপোর্ট , পাওয়ার অব এর্টনি অনুমতি এই কাজই করে হাই কমিশন। তারা বরং বাংলাদেশ বিমান নিয়ে বেশি ধারণা রাখেন। তারা চান বিমানে চড়ে বাংলাদেশে যেতে, অন্যান্য এয়ারলাইন্সের সম মূল্যে বা একটু বেশি হলেও বিমানের সেবা নিতে । টিকেট নেই টিকেট নেই হাহাকার শুনতে চান না। এয়ারপোর্টে হয়রানী মুক্ত থাকতে চান। কর্মকর্তা কর্মচারীদের কাছ থেকে কর্তা সুলভ নয় , একটু সুন্দর আন্তরিক ব্যবহার।
“বিমানের ইঁদুর নিধন জরুরী। হাই কমিশনার নয় ।”
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা যেহেতু নিজেও প্রবাসী , বেসামরিক বিমান পর্যটন মন্ত্রী নিজে প্রবাসী না হলেও প্রবাসীদের সাথে সংশ্লিষ্ট ,তাই এই সব অভিযোগ সমস্যা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল । বাংলাদেশ বিমানের ইঁদুর ধরতে সমস্যা হওয়ার কথা না। পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল এয়ারলাইন্স সম্ভবত বিমান বাংলাদেশ । কিন্ত কখনো লাভের মুখ দেখে না । যুগে যুগে আমরা ক্ষতির গল্পই শুনে আসছি। তাই বিমানের ইঁদুর নিধন জরুরী। হাই কমিশনার নয় । জাতীয় এয়ারলাইন্স ও বিমানবন্দরের সেবার মান উন্নত হলে প্রবাসীরা সেটিকে সবচেয়ে বেশি স্বাগত জানাবেন। কারণ তাদের কাছে এটি শুধু একটি পরিবহন সেবা নয়, বরং দেশের সঙ্গে সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন।
লেখক – সম্পাদক ,প্রকাশক – ব্রিকলেন





