Brick Lane News

প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা ছিল পরিকল্পিত : বিশ্লেষণ স্টার-ডিসমিসল্যাবের

প্রকাশিত: ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৭:২৪ পিএম

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীতে দেশের শীর্ষ দুটি সংবাদপত্র দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানটের কার্যালয়ে সংঘবদ্ধ মব হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো উসকানিমূলক কনটেন্টের সঙ্গে সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া গেছে। পরদিন ১৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও হামলা চালানো হয়।

দ্য ডেইলি স্টার ও তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের যৌথ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৫ থেকে ১৯ ডিসেম্বরের মধ্যে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ৩ হাজার ৬৪টি পোস্টের একটি বড় অংশে সরাসরি সহিংসতার আহ্বান, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং হামলার সমন্বয় ছিল। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অনলাইন উসকানি থেকে বাস্তব সহিংসতায় রূপ নিতে সময় লেগেছে মাত্র কয়েক দিন।

১৫ ডিসেম্বর থেকেই ফেসবুকের কয়েকটি বড় গ্রুপে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারকে লক্ষ্য করে বিদ্বেষমূলক পোস্ট ছড়াতে শুরু হয়। “ভারতীয় দালাল”, “রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি” ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে প্রতিষ্ঠান দুটিকে চিহ্নিত করা হয়। ‘জয় বাংলা করে দিতে হবে’—এ ধরনের বাক্যাংশ ধ্বংসের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

১৭ ডিসেম্বর রাত থেকে সরাসরি হামলার আহ্বান বাড়তে থাকে। ১৮ ডিসেম্বর রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে অন্তত নয়টি পোস্টে প্রথম আলো ভবনে আগুন দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। রাত ১১টা থেকে পৌনে ১২টার মধ্যে আরও ৩৪টি পোস্টে একই ধরনের আহ্বান আসে।

১৮ ডিসেম্বর রাত সোয়া ১১টার দিকে কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে মব জড়ো হয়। রাত পৌনে ১২টার দিকে হামলা শুরু হয়। একই সময়ে ফেসবুকে লাইভ আপডেট ও নির্দেশনা চলতে থাকে কোথায় জড়ো হতে হবে, কোথায় যেতে হবে, কী করতে হবে।

মধ্যরাতের পর দ্য ডেইলি স্টার ভবনেও হামলা শুরু হয়। হামলাকারীরা গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় এবং তিনটি তলায় আগুন ধরিয়ে দেয়। ভবনের ভেতরে ২৯ জন সাংবাদিক ও কর্মী আটকে পড়েন।

ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে গেলে মব বাধা দেয়। পরে যৌথ বাহিনীর সহায়তায় কয়েক ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী জানান, নানা বাধা অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত উদ্ধার ও আগুন নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারে হামলার দুই ঘণ্টা পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধানমন্ডির ছায়ানট ভবনকে লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১৯ ডিসেম্বর রাত দেড়টার দিকে সেখানে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

একইভাবে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়েও হামলার আহ্বান ছড়ায়। ১৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সেখানে আগুন দেওয়া হয়। ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কয়েকজন প্রবাসী ইনফ্লুয়েন্সার দীর্ঘদিন ধরে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। হামলার রাতে তাঁদের কিছু পোস্টে সরাসরি উপস্থিত হতে ও সহিংসতা চালাতে আহ্বান জানানো হয়। এসব পোস্টে অল্প সময়ের মধ্যে লক্ষাধিক প্রতিক্রিয়া পড়ে এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত সহিংসতার আহ্বান বা তা উদ্‌যাপন করে ৯৫৮টি স্বতন্ত্র পোস্ট করা হয়, যাতে ৩ লাখ ৬০ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া পড়ে। প্রায় ১০ লাখ সদস্যবিশিষ্ট আটটি বড় ফেসবুক গ্রুপে ৮৮টি উসকানিমূলক পোস্ট শনাক্ত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সহিংসতার হুমকি ২০ ঘণ্টার বেশি সময় দৃশ্যমান থাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সাইবার পর্যবেক্ষণে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে; অধিকাংশ ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল মনিটরিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক আইরিন খান বলেন, ঘৃণামূলক বক্তব্য ও অপপ্রচার সময়মতো মোকাবিলা না করলে তা সহিংসতায় রূপ নেয়। তিনি এসব হামলাকে দায়মুক্তির সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম সুরক্ষায় ব্যর্থতার ফল হিসেবে উল্লেখ করেন।

মেটার নীতিমালা অনুযায়ী সহিংসতার আহ্বানমূলক কনটেন্ট নিষিদ্ধ হলেও বিশ্লেষিত অনেক পোস্ট হামলার এক মাস পরও অনলাইনে সক্রিয় ছিল। ১৯ ডিসেম্বর বিকেলে বিটিআরসির চিঠির কয়েক ঘণ্টা আগে একটি প্রভাবশালী ফেসবুক পেজ সরানো হলেও ততক্ষণে একাধিক প্রতিষ্ঠানে হামলা ও অগ্নিসংযোগ হয়ে গেছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, অনলাইনে দীর্ঘদিনের বিদ্বেষমূলক বয়ান ও পরিকল্পিত উসকানি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাস্তব সহিংসতায় রূপ নেয়। সমন্বিতভাবে ছড়ানো পোস্ট, লক্ষ্য নির্ধারণ, তাৎক্ষণিক নির্দেশনা এবং উদ্‌যাপনমূলক প্রচারণা সব মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই হামলাগুলোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

Related Posts

দুদিনের ব্যবধানে বাবা-মায়ের মৃত্যু, হাতকড়া পরে আবার জানাজায় দুই ভাই

কক্সবাজারের রামু উপজেলায় দুই দিনের ব্যবধানে বাবা-মাকে হারিয়েছেন কারাগারে থাকা দুই সহোদর ফরিদুল আলম ও মোহাম্মদ ইসমাইল। মায়ের মৃত্যুর পর...

Read more

সর্বশেষ খবর

অন্যান্য ক্যাটাগরি