Brick Lane News

ভুঁইফোড় জরিপের ফাঁদে গণমাধ্যম; আওয়ামী ভোটার নিয়ে বিভ্রান্তিকর দাবি

ভুঁইফোড় জরিপের ফাঁদে গণমাধ্যম; আওয়ামী ভোটার নিয়ে বিভ্রান্তিকর দাবি

আওয়ামী লীগের ভোটারদের একটি বড় অংশ দল বদল করছে, এমন চাঞ্চল্যকর দাবি সম্প্রতি দেশের একাধিক মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই দাবির পেছনে থাকা জরিপটি বৈজ্ঞানিকভাবে দুর্বল, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অস্বচ্ছ এবং যাচাইযোগ্য তথ্যের অভাবে বিশ্বাসযোগ্য নয়।

‘কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ (CRF) এবং ‘বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজ’ (BEPOS) নামের দুটি সংস্থার বরাতে প্রকাশিত জরিপে দাবি করা হয়, আওয়ামী লীগের প্রায় ৪৮.২ শতাংশ ভোটার এবার বিএনপিকে এবং ২৯.৯ শতাংশ জামায়াতকে ভোট দিতে চান। ১১,০৩৮ জন ভোটারের মতামতের ভিত্তিতে এই ফলাফল পাওয়া গেছে বলে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

এই জরিপের ফলাফল প্রথম আলো, বাংলা নিউজ২৪, দৈনিক যুগান্তর, কালের কণ্ঠ, যমুনা টিভিসহ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে এবং ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। পাঁচ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে জনমতের গতিপ্রকৃতি জানার কৌতূহলকে কেন্দ্র করেই এই প্রতিবেদনগুলো ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

তবে ফ্যাক্ট চেক জোনের দীর্ঘ অনুসন্ধানে জরিপটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন উঠে এসেছে। জাতীয় পর্যায়ের একটি জরিপ পরিচালনার জন্য যে সুস্পষ্ট মেথডোলজি, প্রশিক্ষিত জনবল এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের প্রয়োজন হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কোনো স্বচ্ছ তথ্য দিতে পারেনি। জরিপের স্যাম্পলিং ফ্রেম, ডাটা সংগ্রহের পদ্ধতি কিংবা অর্থায়নের উৎস জানতে চেয়ে ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইমেইল পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিক গবেষণা নীতিমালা অনুযায়ী এ ধরনের তথ্য গোপন রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।

সংস্থাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ও প্রশ্নের বাইরে নয়। CRF–এর ওয়েবসাইট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এটি তুলনামূলকভাবে নতুন এবং উল্লেখযোগ্য কোনো বড় গবেষণা কার্যক্রমের রেকর্ড নেই। অন্যদিকে BEPOS নামে কোনো স্বতন্ত্র ওয়েবসাইট, নিবন্ধিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা পূর্ববর্তী কাজের তথ্য অনলাইনে পাওয়া যায়নি। ফলে এটি শুধুমাত্র এই জরিপ প্রকাশের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত একটি শেল অর্গানাইজেশন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জরিপটির নিরপেক্ষতা নিয়ে আরও উদ্বেগ তৈরি করেছে CRF–এর বোর্ড অব ডিরেক্টরসে থাকা ইলিয়াস হোসেন নামের এক বিতর্কিত ব্যক্তির উপস্থিতি। তিনি ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক ও অপ্রমাণিত তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে সমালোচিত এবং সম্প্রতি সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগে তার ফেসবুক পেজ মেটা কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দেয়। একজন প্রকাশ্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যক্তির সম্পৃক্ততা একটি জাতীয় রাজনৈতিক জরিপের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এ ছাড়া জরিপে বিশেষজ্ঞ হিসেবে যাকে উপস্থাপন করা হয়েছে, তিনি মূলত কৃষি বিজ্ঞান ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গবেষক। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা পরিসংখ্যানের বিশেষজ্ঞের পরিবর্তে অপ্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রের গবেষকের যুক্ত থাকা জরিপটির পেশাদার মান ও বিশ্লেষণ সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বড় রাজনৈতিক দাবি প্রকাশের আগে গণমাধ্যমের উচিত ছিল জরিপকারী সংস্থার সক্ষমতা, নিরপেক্ষতা এবং গবেষণা পদ্ধতি যাচাই করা। কিন্তু প্রয়োজনীয় ক্রস-চেক ও গেটকিপিং ছাড়াই তথ্য প্রচার করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে।

সব দিক বিবেচনায় ফ্যাক্ট চেক জোন এই জরিপকে বিভ্রান্তিকর ও যাচাইঅযোগ্য হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। জরিপের ফলাফলের রাজনৈতিক তাৎপর্যের চেয়ে এর পদ্ধতিগত দুর্বলতা, অস্বচ্ছতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিতর্কিত ভূমিকা এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের চাঞ্চল্যকর জরিপের ফলাফল গ্রহণের আগে সাধারণ মানুষের যেমন সতর্ক থাকা প্রয়োজন, তেমনি গণমাধ্যমগুলোরও উচিত সংবেদনশীল রাজনৈতিক সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে আরও কঠোর সম্পাদকীয় যাচাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা।

Related Posts

Social Media

সর্বশেষ খবর