দেশে সাম্প্রতিক সময়ে উগ্রপন্থী ও নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর পুনরুত্থান জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। জামায়াতে ইসলামীসহ নিষিদ্ধ সংগঠন হিজবুত তাহরীর এবং জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (JMB)-এর আদর্শিক তৎপরতা, সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এসব গোষ্ঠীর সক্রিয়তা কেবল নিরাপত্তা ঝুঁকিই নয়, বরং দীর্ঘদিনের সন্ত্রাসবিরোধী অর্জন, ধর্মীয় সহনশীলতা ও বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। রাজনৈতিক পরিসরে চরমপন্থী শক্তির প্রতি নীরব সহনশীলতা বা পরোক্ষ বৈধতা এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।একই সময়ে দেশে নারী নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটছে। ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন ও লিঙ্গভিত্তিক অপরাধের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অধিকাংশ ঘটনায় কার্যকর তদন্ত ও বিচার না হওয়ায় দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর ওপর নিপীড়ন, হুমকি ও সহিংসতা বেড়েছে, যা সামাজিক সংহতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি দেশে আইনশৃঙ্খলার চরম অবক্ষয় লক্ষ করা যাচ্ছে—জনতার হাতে বিচার, উচ্ছৃঙ্খলতা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, পুলিশ হেফাজত বা জেলে থাকা মানুষের মৃত্যু আইনের শাসনকে কার্যত অকার্যকর করে তুলছে। গত বছর জুলাই আগস্টে লুট হওয়া অস্ত্র সরকার এখনো উদ্ধার করতে পারে নাই। এই হুমকি বিদ্যমান রয়ে গেছে। নির্বাচনের সময় এর প্রভাব পরিলক্ষিত হবে বলেই সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক পরিসরও ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা করার কারণে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, হয়রানি, নজরদারি ও আইনি চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। গণমাধ্যমের ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, সেন্সরশিপ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের নীতি নির্ধারণী উচ্চপর্যায়ে দলীয় লোকদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।এর পাশাপাশি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মুক্তচিন্তা, জাতীয় চেতনা ও বহুত্ববাদী সামাজিক মূল্যবোধের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। উদিচী ,ছায়ানট এর বড় প্রমাণ।
এই প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা নিয়ে জনমনে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত করার উদ্যোগের কারণে। অনুগত রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে পদ্ধতিগতভাবে দমন করার ফলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ছে। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যা একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আসন্ন নির্বাচন একটি অ-অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় পরিণত হওয়ার কিংবা জামায়াত-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর মাধ্যমে কার্যত হাইজ্যাক হওয়ার আশঙ্কা। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে জামায়াত-ঘনিষ্ঠ শক্তির ঘনিষ্ঠতার ধারণা, কর্তৃত্ববাদী জনতাবাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ গণতন্ত্রের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে। ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, রাজনৈতিক গ্রেপ্তার, নজরদারি ও ভিন্নমত দমনের প্রবণতা এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করছে, যেখানে অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে।
এই সমন্বিত সংকট—উগ্রপন্থার পুনরুত্থান, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণমাধ্যম দমন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অবক্ষয়—দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যতের জন্য একটি কাঠামোগত হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
লেখক – সাংবাদিক,কলামিষ্ট


