Skip to main content

Brick Lane News

১৫ আগস্ট: জাতীয় শোক ও জাতীয় কলঙ্ক

১৫ আগস্ট: জাতীয় শোক ও জাতীয় কলঙ্ক

IMG 0779 ১৫ আগস্ট: জাতীয় শোক ও জাতীয় কলঙ্ক

 

 

 

 

 

 

 

জুয়েল রাজ-

১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গভীর বেদনাবিধুর দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে সংঘটিত সেই হত্যাকাণ্ড শুধু একজন রাষ্ট্রনায়কের জীবনাবসান ছিল না, ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পথচলার ওপর ভয়াবহ আঘাত। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের নির্মম হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক ক্ষত সৃষ্টি করেছে, যার রক্তচিহ্ন আজও আমাদের জাতীয় বিবেককে প্রশ্ন করে।

এই হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের দিকে। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, লাখো মানুষের আত্মত্যাগ এবং অগণিত মানুষের নির্যাতন ও বাস্তুচ্যুতির মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশ। স্বাধীনতার ঘোষিত লক্ষ্য ছিল কেবল একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা নয়; ছিল মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। ১৯৭২ সালের সংবিধানেও রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতিতে সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছিল।

কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার মধ্য দিয়ে সেই নবীন রাষ্ট্র ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে সামরিক ও সামরিক-সমর্থিত রাজনৈতিক শাসনের দীর্ঘ অধ্যায়। পরবর্তী সময়ে সংবিধান পরিবর্তন, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ক্ষমতার পালাবদল, অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান এবং রাজনৈতিক সহিংসতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিকাশকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে।

১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডি তাই কোনো একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি রাষ্ট্রের ইতিহাসে রাজনৈতিক সহিংসতার এক ভয়ংকর দৃষ্টান্ত। একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং অন্যদের হত্যার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আইন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে অস্ত্র ও সহিংসতার যে নজির তৈরি হয়েছিল, তার দীর্ঘ ছায়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহু বছর ধরে বিস্তৃত ছিল।

বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সেদিন নারী ও শিশুও হত্যার শিকার হন। তাঁর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামালসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা প্রাণ হারান। শেখ রাসেল তখন মাত্র শিশু। একটি শিশুরও হত্যার শিকার হওয়া ১৫ আগস্টের নির্মমতাকে আরও গভীর ও হৃদয়বিদারক করে তোলে। ইতিহাসের বিচারে এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি প্রাণহানি আমাদের রাষ্ট্রীয় বিবেকের সামনে একটি করে অমোচনীয় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

১৫ আগস্টের পর হত্যাকাণ্ডের বিচারও দীর্ঘদিন বাধাগ্রস্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সেই বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে যায় এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় দণ্ডিত কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। কিন্তু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হওয়া আর সেই হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক কারণগুলোর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন এক বিষয় নয়। একটি জাতির পরিণত হওয়ার জন্য প্রয়োজন শুধু অপরাধীর বিচার নয়, অপরাধের পটভূমি, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির দুর্বলতাগুলোকেও নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করা।

দুঃখজনকভাবে, ১৫ আগস্টের স্মৃতি নিয়েও বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন বিভক্ত থেকেছে। একদিকে বঙ্গবন্ধুর অবদান ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অস্বীকার বা খাটো করার প্রবণতা দেখা গেছে, অন্যদিকে ইতিহাসের কিছু অধ্যায়কে দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। ইতিহাস যখন গবেষণা ও সত্য অনুসন্ধানের বিষয় না হয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণের অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সত্য, ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাতীয় ঐক্য।

এরই মধ্যে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের জন্ম দেয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়। ঘটনাটি শুধু একটি ভবনের ক্ষতি হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য অনুধাবন করা কঠিন হবে। কারণ কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত স্থাপনা ধ্বংস করা মানে অনেক সময় একটি বিতর্কিত অতীতের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ককেও আঘাত করা।

রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে। কোনো নেতার কর্মকাণ্ডের সমালোচনা হতে পারে। ইতিহাসের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের পুনর্মূল্যায়নও হতে পারে। কিন্তু কোনো জাতির ইতিহাসকে ভবন ভেঙে, স্মৃতিচিহ্ন পুড়িয়ে কিংবা বই ও দলিল নষ্ট করে মুছে ফেলা যায় না। বরং তাতে ইতিহাস আরও বিকৃত হয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সত্য জানার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড এবং ২০২৪ সালের ধানমণ্ডি ৩২-এর ধ্বংসযজ্ঞ এক নয়। দুই ঘটনার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, চরিত্র ও মাত্রা ভিন্ন। কিন্তু উভয় ঘটনার মধ্যে একটি বিপজ্জনক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়: রাজনৈতিক বিরোধ ও ক্ষোভের প্রকাশ যখন যুক্তি, প্রতিষ্ঠান ও আইনের পথ ছেড়ে সহিংসতার দিকে যায়, তখন ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত পুরো জাতির হয়।

একটি সভ্য রাষ্ট্রে ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্ক হওয়া উচিত সত্য, গবেষণা ও যুক্তির। কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে দেবত্ব দেওয়া যেমন ইতিহাসচর্চার পথ নয়, তেমনি রাজনৈতিক বিরোধের কারণে তাঁকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টাও গ্রহণযোগ্য নয়। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন, তাঁর সাফল্য, সীমাবদ্ধতা, রাষ্ট্র পরিচালনার সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক নীতি এবং তাঁর সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে গবেষণা হতে পারে, হওয়া উচিত। কিন্তু সেই গবেষণা হতে হবে দলীয় আনুগত্যের বাইরে, তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে।

কারণ ইতিহাস কারও একার সম্পত্তি নয়। ইতিহাস একটি জাতির সম্মিলিত স্মৃতি।

আজ ১৫ আগস্টের দিকে ফিরে তাকালে আমাদের শুধু শোকাহত হওয়া যথেষ্ট নয়; আত্মজিজ্ঞাসাও জরুরি। কেন একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে সপরিবারে হত্যা করা সম্ভব হয়েছিল? কেন রাজনৈতিক বিরোধ বারবার সহিংসতায় পরিণত হয়? কেন আমরা প্রতিপক্ষের ইতিহাস মুছে ফেলতে চাই? কেন ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতি, প্রতীক ও ইতিহাসের মূল্যায়নও বদলে যায়? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে না পারলে আমরা একই ভুলের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকে মুক্ত হতে পারব না।

১৫ আগস্ট আমাদের কাছে তাই শোকের দিন, আবার সতর্কতারও দিন। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে, আইনের শাসন ভঙ্গুর হলে এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা হারিয়ে গেলে একটি জাতির অর্জনও কত দ্রুত বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে।

আজ প্রয়োজন প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস। প্রয়োজন ইতিহাসকে দলীয় মালিকানা থেকে মুক্ত করে গবেষণা, বিতর্ক ও প্রমাণের আলোয় দেখা। প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর অবদান এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অভিযাত্রার পাশাপাশি ইতিহাসের বিতর্কিত ও অন্ধকার অধ্যায়গুলোকেও নির্মোহভাবে পর্যালোচনা করা। প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করা হবে না এবং মতভেদকে হত্যার কারণ বানানো হবে না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই: **রাজনৈতিক সহিংসতা কখনো কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না।**

১৫ আগস্টের শোক যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। এই শোক আমাদের বিবেককে জাগ্রত করুক। ধানমণ্ডি ৩২-এর স্মৃতি কিংবা বাংলাদেশের অন্য কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা যেন আর কখনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার লক্ষ্য না হয়। ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হোক সত্যের, স্মৃতির এবং দায়িত্বের।

যে বাংলাদেশ লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে জন্ম নিয়েছিল, সেই বাংলাদেশে আর কোনো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, কোনো প্রতিহিংসা, কোনো স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস কিংবা কোনো নাগরিকের ওপর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নিপীড়ন যেন না ঘটে।

১৫ আগস্টের শোক তখনই অর্থবহ হবে, যখন এই শোক থেকে আমরা শিখব।ইতিহাস মুছে নয়, ইতিহাসকে সত্যের আলোয় ধারণ করেই একটি জাতি সামনে এগিয়ে যায়।**

১৫ আগস্ট তাই আমাদের জাতীয় শোকের দিন। একই সঙ্গে এটি আমাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা, অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার ইতিহাসের এক গভীর কলঙ্কের স্মারক। সেই কলঙ্কের পুনরাবৃত্তি না করার অঙ্গীকারই হোক আজকের দিনের সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি।