Brick Lane News

আওয়ামী লীগ শাসনামলে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার : সংসদে তারেক রহমানের বক্তব্য বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা

প্রকাশিত ৩ এপ্রিল ২০২৬ । ১:৪১ পিএম

ফ্যাক্ট-চেক প্রতিবেদন

প্রকাশিত: ৩ এপ্রিল, ২০২৬ | ডেস্ক রিপোর্ট, ব্রিকলেন নিউজ

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৫ বছরের শাসনামলে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচারের একটি দাবি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে ফ্যাক্ট-চেক জোন (Fact-Check Zone) এবং ব্রিকলেন নিউজের যৌথ তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, এই দাবিটি গাণিতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত এবং বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা ।

রেটিং: বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা
উৎস: ফ্যাক্ট-চেক জোন বিশ্লেষণ

বাজেটের আকারের তুলনায় দাবিটি কতটুকু যৌক্তিক?

আওয়ামী লীগ সরকারের ২০০৯-১০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ১৫টি বাজেটের যোগফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর মোট পরিমাণ প্রায় ৫৬.৫ ট্রিলিয়ন টাকা বা তৎকালীন গড় ডলার রেটে প্রায় ৫৬৫ বিলিয়ন ডলার।

যুক্তি: যদি ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচারের দাবিটি সত্য হয়, তবে এর অর্থ হলো মোট বাজেটের প্রায় ৪১.৪% টাকাই পাচার হয়েছে। যা একটি দেশের রাষ্ট্র পরিচালনা এবং বিশাল অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে অসম্ভব বলে মনে করছেন ফ্যাক্ট-চেক জোনের বিশ্লেষকরা।

১৫ বছরের পূর্ণাঙ্গ বাজেট তালিকা (কোটি টাকায়)

অর্থবছর বাজেট পেশকারী পরিমাণ (কোটি টাকা)
২০০৯-১০ আবুল মাল আবদুল মুহিত ১,১৩,৮১৫
২০১০-১১ আবুল মাল আবদুল মুহিত ১,৩২,১৭০
২০১১-১২ আবুল মাল আবদুল মুহিত ১,৬৩,৫৮৯
২০১২-১৩ আবুল মাল আবদুল মুহিত ১,৯১,৭৩৮
২০১৩-১৪ আবুল মাল আবদুল মুহিত ২,২২,৪৯১
২০১৪-১৫ আবুল মাল আবদুল মুহিত ২,৫০,৫০৬
২০১৫-১৬ আবুল মাল আবদুল মুহিত ২,৯৫,১০৯
২০১৬-১৭ আবুল মাল আবদুল মুহিত ৩,৪০,৬০৫
২০১৭-১৮ আবুল মাল আবদুল মুহিত ৪,০০,২৬৬
২০১৮-১৯ আবুল মাল আবদুল মুহিত ৪,৬৪,৫৭৩
২০১৯-২০ আ হ ম মুস্তফা কামাল ৫,২৩,১৯০
২০২০-২১ আ হ ম মুস্তফা কামাল ৫,৬৮,০০০
২০ ২০২১-২২ আ হ ম মুস্তফা কামাল ৬,০৩,৬৮১
২০২২-২৩ আ হ ম মুস্তফা কামাল ৬,৭৮,০৬৪
২০২৩-২৪ আ হ ম মুস্তফা কামাল ৭,৬১,৭৮৫

দৃশ্যমান উন্নয়ন বনাম পাচারের পরিসংখ্যান

গত ১৫ বছরে দেশে রেকর্ড পরিমাণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হয়েছে।

মেগা প্রকল্পের নাম ব্যয় (কোটি টাকা) সাফল্য
পদ্মা বহুমুখী সেতু ৩২,৬০৫ নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত।
রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প ১,১৩,০৯২ প্রথম পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র।
ঢাকা মেট্রো রেল (MRT-6) ৩৩,৪৭২ যানজট নিরসনে মাইলফলক।
বঙ্গবন্ধু টানেল ১০,৬৮৯ দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নদীগর্ভস্থ টানেল।

যদি ২৩৪ বিলিয়ন ডলার স্রেফ পাচার হয়ে যেত, তবে এই মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় কয়েক লক্ষ কোটি টাকার সংস্থান করা সম্ভব হতো না।

কেন এই দাবিটি বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা?

  • জিডিপির তুলনায় অসম্ভব: বাংলাদেশের বর্তমান জিডিপি প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার মানে দেশের মোট অর্থনীতির অর্ধেকের বেশি উধাও হয়ে যাওয়া, যা গাণিতিকভাবে অবাস্তব বলে জানাচ্ছে ফ্যাক্ট-চেক জোন
  • তথ্যের অভাব: দাবিকারী কোনো স্বীকৃত আন্তর্জাতিক সংস্থা বা ব্যাংক অডিট রিপোর্ট পেশ করতে পারেননি।
  • আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ডাটা: GFI এর রিপোর্ট অনুযায়ী বছরে গড়ে ৭-৮ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়। ১৫ বছরের তাত্ত্বিক যোগফল কোনোভাবেই ২৩৪ বিলিয়ন স্পর্শ করে না।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে যেখানে ৬৮.৩ বিলিয়ন ডলার বা ৬৮৩০ কোটি ডলার সংখ্যাটি বলা হয়েছে, সেটি একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা GFI-এর রিপোর্ট থেকে এসেছে।

কিন্তু GFI সরাসরি বলেনি যে এই পুরো টাকাই নিশ্চিতভাবে পাচার হয়েছে। তারা বলেছে, এটা বাণিজ্যের হিসাবের অমিল দেখে করা একটি ঝুঁকির হিসাব।

রিপোর্টে তারা লিখেছে, এটি “not as a direct measure of proven illicit proceeds”, মানে এটি প্রমাণিত পাচারের সরাসরি হিসাব নয়।

তারা আরও বলেছে, এই কাজটি করা হয়েছে “to estimate the order of magnitude of trade misinvoicing risks”, অর্থাৎ বাণিজ্যে ভুল বা গরমিলের কারণে কত বড় ঝুঁকি থাকতে পারে, তার একটা আন্দাজ বের করতে।

এখানে সহজ করে দেখা যাক।

ধরুন, আপনি বললেন,  আপনি ১০০ টাকার ১০টা খাতা বিক্রি করেছেন । কিন্তু আপনার বন্ধু লিখল সে ১২০ টাকার খাতা কিনেছে। এখানে ২০ টাকার গরমিল দেখা গেল। এই গরমিল দেখে সন্দেহ করা যেতে পারে কিছু একটা ভুল আছে।

কিন্তু শুধু গরমিল দেখেই বলা যায় না যে টাকা চুরি হয়েছে। প্রথমে দেখতে হবে হিসাব ভুল হয়েছে কি না, দাম লেখায় ভুল হয়েছে কি না, নাকি অন্য কোনো কারণে পার্থক্য হয়েছে। GFI-এর হিসাবও এমনই। তারা গরমিল দেখেছে, কিন্তু সেই গরমিলকে সরাসরি “প্রমাণিত পাচার” বলেনি।

সঠিক তথ্য পাওয়ার নির্ভরযোগ্য মাধ্যম

প্রকৃত পাচারের পরিমাণ সম্পর্কে জানতে সাধারণ মানুষের উচিত নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয় মাধ্যম অনুসরণ করা:

  • Global Financial Integrity (GFI)
  • সুইস ব্যাংক (SNB) বার্ষিক রিপোর্ট
  • বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU)
  • ফ্যাক্ট-চেক জোন (Fact-Check Zone) ডাটাবেজ

ব্রিকলেন নিউজ ও ফ্যাক্ট-চেক জোন সিদ্ধান্ত

সার্বিক গাণিতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ শেষে বলা যায়, “২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার” হওয়ার দাবিটি পুরোপুরি ভিত্তিহীন এবং একটি অতিরঞ্জিত রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা। এটি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর

তথ্যসূত্র: অর্থ মন্ত্রণালয় (বাংলাদেশ), ফ্যাক্ট-চেক জোন রিসার্চ ডেস্ক, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং GFI এনুয়াল রিপোর্ট।

Related Posts

টাওয়ার হ্যামলেটস রাজনীততে চমক উইং কমান্ডার (অব:) আমিন রহমান

লন্ডনের বাঙালি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের মাইল এন্ড ওয়ার্ডে গ্রীন পার্টির কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন উইং কমান্ডার (অব:) আমিন...

Read more

সর্বশেষ খবর

অন্যান্য ক্যাটাগরি