বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ৫৬তম দিবস উপলক্ষে লন্ডনেগানে গানে উদযাপিত হলো এক আবেগঘন সাংস্কৃতিক আয়োজন।প্রবাসে থেকেও মাতৃভূমির ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বীরশহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে স্বাধীনতা মঞ্চের উদ্যোগেঅনুষ্ঠিত হয় “গানে গানে স্বাধীনতা দিবস” উদযাপন অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই বিলেতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্রনির্মাতা মকবুল চৌধুরী নির্মিত একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হয়। স্মরণ করা হয় একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। স্মরণকরা হয় একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। বিলেতেবসবাসরত মুক্তিযোদ্ধাদের মঞ্চে আমন্ত্রণ জানিয়ে ফুল দিয়ে বরণকরা হয়, এবং তাদের মঞ্চে রেখে রনাঙ্গনে তাঁদের অদম্য সাহস, আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাসের প্রতি সম্মান জানিয়ে উপস্থিতসবাই দাঁড়িয়ে নীরবে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
সেই মুহূর্তে যেন লন্ডনের প্রবাসী প্রাঙ্গণেও ফিরে আসে মুক্তিযুদ্ধেরউত্তাল দিনগুলোর স্মৃতি, যে স্মৃতির ভেতর জড়িয়ে আছে বাঙালিরস্বাধীনতার অমর গৌরবগাথা।
অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষন প্রদান করে ছোট্ট শিশু অয়ন।
এরপর শুরু হয় সংগীত পরিবেশনা। শিল্পীরা একে একে পরিবেশনকরেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অমর গান, মুক্তিযুদ্ধেররণসঙ্গীত এবং দেশাত্মবোধক বিভিন্ন সংগীত। সুরের মূর্ছনায় যখনভেসে ওঠে স্বাধীনতার গান, তখন হলভর্তি দর্শকের হৃদয়ে যেনজেগে ওঠে একাত্তরের সেই অদম্য চেতনা। গানের পরতে পরতেফুটে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সংগ্রাম ও বিজয়ের গৌরবময় স্মৃতি।
সঙ্গীত পরিবেশন করেন, খ্যাতিমান সঙ্গীত শিল্পী গৌরি চৌধুরী, বাউল শহীদ, লাবনী বড়ুয়া, শাহনাজ সুমি, মোহনা, রুবি সরকার, মিষ্টি তালুকদার, তারেক হাসান, বন্যা তালুকদার, অমিত দে, সিগ্ধা রায়, অবলা, শ্রেয়সী, মৃদুল, জয়, শুভাঙ্গী, সাদমান খানপ্রমূখ।
স্বাধীনতা মঞ্চের দুই সংগঠকের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আয়োজিত এইঅনুষ্ঠান প্রাণবন্ত উপস্থাপনা করেন অন্যতম সংগঠক খ্যাতিমানসাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব উর্মি মাজহার। তাঁর সাবলীল বাচনভঙ্গি, উষ্ণউপস্থিতি এবং আবেগঘন উপস্থাপনায় পুরো অনুষ্ঠান হয়ে ওঠেআরও প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আরেক সংগঠক সিনিয়রসাংবাদিক এবং সাপ্তাহিক সত্যবাণী সম্পাদক সৈয়দ আনাসপাশা।
তার বক্তব্যে তিনি বলেন, আজ আমরা শুধু একটি দিনউদযাপন করতে এখানে সমবেত হইনি, আমরা এসেছি আমাদেরআত্মপরিচয়কে স্মরণ করতে, আমাদের ইতিহাসকে নতুন করেউচ্চারণ করতে। কারণ এই স্বাধীনতা হঠাৎ করে আসেনি; এটিঅর্জিত হয়েছে অগণিত শহীদের রক্তে, মা–বোনের ত্যাগে, আর একমহান নেতা বঙবন্ধুর অবিচল সাহসী নেতৃত্বে। কিন্তুদুঃখজনকভাবে, আজও কিছু অপশক্তি, কিছু বিভ্রান্ত চেতনাআমাদের সেই গৌরবময় ইতিহাসকে মুছে দিতে চায়। তারা আঘাতহানতে চায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, ধ্বংস করতে চায়আমাদের স্মৃতির ভিত্তি। কিন্তু আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যেইতিহাস রক্তে লেখা, তা কখনো মুছে ফেলা যায় না; যে সত্যআত্মত্যাগে নির্মিত, তা কখনো পরাজিত হয় না।
তাঁর বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশেরস্বাধীনতার ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করা এবং নতুনপ্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব। তিনিগভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন একাত্তরের বীর শহীদ ওমুক্তিযোদ্ধাদের, যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পৃথিবীর মানচিত্রেজন্ম নিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ।
হলভর্তি দর্শকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি যেন পরিণত হয় একঅনন্য মিলনমেলায়। এতে রাজনীতিক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিরসুপরিচিত ব্যক্তিসহ সর্বস্তরের মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সবারঅংশগ্রহণে প্রবাসের মাটিতে সৃষ্টি হয় এক হৃদয়ছোঁয়া আবহ, যেখানে স্বাধীনতার গান আর স্মৃতির আবেগ মিলেমিশে হয়ে ওঠেএক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।
গান, স্মৃতিচারণ এবং শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে লন্ডনের এইআয়োজন যেন আবারও মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশ কেবলএকটি ভৌগোলিক সীমানা নয়; এটি ত্যাগ, সংগ্রাম এবং অদম্যআত্মমর্যাদার এক ইতিহাস। আর সেই ইতিহাস বুকে ধারণ করেইপ্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেনস্বাধীনতার চেতনাকে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকদের মন্তব্য– প্রবাসে স্বাধীনতা মঞ্চের এইআয়োজন কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, এটি ইতিহাসকেস্মরণ করার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলারএবং বাংলাদেশকে হৃদয়ের গভীরে ধারণ করার এক উজ্জ্বলপ্রয়াস।





