Brick Lane News

আর্টেমিস ২ থেকে আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রার দূরত্ব

প্রকাশিত ৯ এপ্রিল ২০২৬ । ৮:০৩ পিএম
জুয়েল রাজ 
আমার এই লেখা যখন পাঠক পড়বেন তখন পৃথিবী থেকে প্রায় চার লাখ ছয় হাজার ৭৭১ কিলোমিটার বা দুই লাখ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল পথ ঘুরে চারজন নভোচারী  পৃথিবীতে ফিরে আসবেন হয়ত। এর আগে মহাকাশে এত দূরে কোনো মানুষ যেতে পারেনি। গত সোমবার গ্রিনিচ মান মন্দিরের সময় বিকেল তিনটা ৫৮ মিনিটে চার নভোচারী চাঁদের পেছন দিকে সবচেয়ে দূরবর্তী জায়গায়টিতে পৌঁছান।
দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীর বিরতি কাটিয়ে মানবজাতিকে আবারও চাঁদের কক্ষপথে ফিরিয়ে নিতে ঐতিহাসিক ‘আর্টেমিস–২’ গত ৬ মার্চ ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে বিশালাকৃতির রকেট উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে এই রোমাঞ্চকর অভিযানের সূচনা করে।
আর্টেমিস–২  প্রায় ১০ দিনের এই দীর্ঘ মহাকাশযাত্রায় নভোচারীরা প্রথমে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করবেন এবং এরপর চাঁদের চারপাশে ‘ফিগার-এইট’ আকৃতির পথে উড্ডয়ন করবে।
নাসার এই চন্দ্রাভিযানকে ভবিষ্যতের মঙ্গল গ্রহে অভিযানের একটি প্রস্তুতি ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো–১৭ মিশনের পর এটিই হবে চাঁদের কক্ষপথে মানুষের প্রথম পদযাত্রা। আর্টেমিস–২ মিশন সফল হলে নাসা পরবর্তী ধাপ ‘আর্টেমিস–৩’ নিয়ে কাজ শুরু করবে, যার মাধ্যমে ২০২৭ বা ২০২৮ সালের দিকে দীর্ঘ ৫৪ বছর পর মানুষ সরাসরি চাঁদের মাটিতে পা রাখবে।
আর আমরা তখন ব্যস্ত ভীষণ শোভাযাত্রা কি মঙল হবে না আনন্দ হবে নাকি বৈশাখি শোভাযাত্রা হবে।
মঙ্গলের অমঙ্গল  কোথায় আসলে ?
মঙ্গল শব্দটি সংস্কৃত ভাষার “মঙ্গল” (मंगल) শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ “সুখ”, “শুভ”, বা “কল্যাণ”। এই শব্দটি প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতিতে ব্যবহৃত হতো সুখ, সমৃদ্ধি, এবং কল্যাণের দেবতাকে বোঝাতে।
মঙ্গল শব্দটি প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্রেও ব্যবহৃত হতো, যেখানে এটি একটি গ্রহের নাম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। মঙ্গল গ্রহটি রোমান যুদ্ধের দেবতা মার্সের সাথে সম্পর্কিত।বাংলা ভাষায়, মঙ্গল শব্দটি সুখ, শুভ, বা কল্যাণ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
আরবীতে  খুঁজতে গিয়ে দেখলাম  মঙ্গল  শব্দটা আছে কি নেই !সেখানে বলা হচ্ছে এর আরবী উচ্চারণ আর মিররিখ। শব্দটি আগুনের সাথে সম্পর্কিত, যা মঙ্গল গ্রহের লাল রঙকে নির্দেশ করে
এটি মহাকাশ বা সৌরজগতের মঙ্গল গ্রহকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
আরবি কবিতায় অনেক সময় সাহস, বীরত্ব বা তীব্র রাগ বোঝাতে মঙ্গলের লাল আভার রূপক ব্যবহার করা হয়।
সুদানের বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব আল-মিররিখ এসসি এর নাম ও মঙ্গল গ্রহের  নামেই রাখা হয়েছে।
আবার আল – মিররিখ আক্ষরিক অর্থ হলো— তেল মালিশ করা বা ঘষা ,প্রাচীনকালে ধারণা করা হতো আগুনের কাঠে কাঠে ঘর্ষণে যে লালচে আভা বা স্ফুলিঙ্গ বের হয়, মঙ্গল গ্রহের লাল রঙ তারই প্রতীক। এই কারণে একে ‘আল-মুহাররিক’ (দহনকারী) বা ‘আল-আহমার’ (লাল) বলা হতো।
তার মানে  মঙ্গল   গ্রহের কারনেই হোক অথবা রঙের কারনেই হোক শব্দটি সব ভাষায়ই কোন  না  কোন ভাবে আছে।
আমাদের বাংলাদেশে ও মঙ্গল  শোভাযাত্রা নামে একটি আয়োজন আছে । যা আবার ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর ২০০৩ কনভেনশনের ১১তম আন্তঃরাষ্ট্রীয় পর্ষদের সভায় ঢাকার মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মঙ্গল শোভাযাত্রা অন পহেলা বৈশাখ (বাংলা: পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা) শিরোনামে অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
পহেলা বৈশাখ কবে কোথায় কিভাবে শুরু হয়েছে সেসব নিয়ে ইতিহাসে নানা মত আছে , আমি ঐতিহাসিক বিতর্ক নিয়ে আলোচনায় যাচ্ছি না।
পূজা ,রোজা, ঈদ ,  মহরম বড়দিন , বৌদ্ধ পূর্ণিমা সহ নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠান বাংলাদেশে উদযাপিত হয়, যা নিজ নিজ ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেই পালিত হয়। বাংলাদেশে একমাত্র উৎসব হয়ে উঠেছিল পহেলা বৈশাখ যা সব ধর্মের মানুষের ঐক্যের আনুষ্ঠানিকতা হয়ে উঠেছে।ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার বাইরে এসে মানুষ এক কাতারে মিলিত হওয়ার এক ক্ষেত্র তৈরী করেছে।
এবং এর একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও অর্জিত হয়েছে। পৃথিবীর বহু দেশে ,বিশেষ করে আলোচনা যখন ধর্মীয় ভাবে আলোচিত হয় ,ইসলামী দেশ সমূহে ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসাবে এই জাতীয় উৎসবের প্রচলন আছে । সমস্যা কেন শুধু বাংলাদেশে ?
বাংলাদেশের  মাটির সাথে মিশে থাকা , যাত্রাপালা, মেলা , বাউল উৎসব ,পালাগান  এখন আর নাই বললেই চলে, ধর্মীয় অনুশাসন আর ধর্ম রক্ষার নামে সব বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
সর্বশেষ, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ঈমান, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংবিধানিক অধিকার এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ‘মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত’ হওয়ার আশঙ্কায় পহেলা বৈশাখে অনুষ্ঠিত মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে।
গত রোববার (৫ এপ্রিল) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন জনস্বার্থে এই রিট দায়ের করেন। রিটে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, ঢাকা জেলা প্রশাসক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং চারুকলা অনুষদের ডিনকে বিবাদী করা হয়েছে।
রিটে আরও বলা হয়েছে, পাখি, মাছ ও পশুর বিশালাকৃতির প্রতিকৃতি বহন করে মঙ্গল বা কল্যাণ প্রার্থনা করা ইসলামী আকিদা ও ইমানের সম্পূর্ণ পরিপন্থি, কারণ মুসলমান কেবলমাত্র আল্লাহর কাছেই মঙ্গল বা কল্যাণ প্রার্থনা করতে পারে।
রিটে বলা হয়, মঙ্গল শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত বহু প্রতিকৃতি হিন্দু ধর্মীয় বিভিন্ন প্রতীকের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত, যা মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র ধর্মীয় ক্ষোভ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে দেশে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের বাস্তব, আসন্ন এবং অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সরকার বাহাদুর মঙ্গল  শোভাযাত্রা বন্ধ না করলে ও বাংলা নববর্ষে পহেলা বৈশাখে যে শোভাযাত্রাটি হবে, তা আর আনন্দ বা মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে হবে না, এবার সেটি ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে উদযাপিত হবে বলে জানিয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার মঙ্গল শোভাযাত্রাকে আনন্দ শোভযাত্রা করেছে। আনন্দ আর মঙ্গলের পার্থক্য নেই। আপাত দৃষ্টিতে এসব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার কিছু নেই। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব পালন করছে। আমরা এটার নাম দিয়েছি বৈশাখী শোভাযাত্রা। আমারা ইউনেস্কো কে জানিয়ে দেব- এটার নাম হবে এখন বৈশাখী শোভাযাত্রা।
সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, আমরা বিভাজন বা সংঘাত চাই না। আমরা পহেলা বৈশাখের উদযাপন নাম নিয়ে সংকট তৈরি করতে চাই না। আমাদের সিদ্ধান্ত হলো আনন্দ বা মঙ্গল শোভাযাত্রা নয়। এটার নাম হবে বৈশাখী শোভাযাত্রা।
তিনি আরও বলেন, পহেলা বৈশাখ আমাদের সংস্কৃতির ঐতিহাসিক ঐতিহ্য। নানা আয়োজনে অতীত থেকেই এটা দেশে পালন করা হচ্ছে। হাজার বছরের পুরনো পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রা নিয়ে নানা মত-দ্বিমত রয়েছে। এরশাদের সময়ে এটা আনন্দনযাত্রা, আবার পতিত আওয়ামী লীগের সময়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়েছে।
তাঁর শেষ কথায় এই শোভাযাত্রার নামের খৎনার বিষয়টি পরিস্কার।
আর্টেমিস ২ এর আলোচনাটা শুরুতে এইজন্যই শুরু করেছিলাম। পৃথিবী  মহাশক্তিগুলো যখন চাঁদ দখল নিয়ে ব্যস্ত, মঙ্গল গ্রহে নিজেদের দখল নিতে ব্যস্ত , আমরা তখন ব্যস্ত আছি মঙ্গলের  খৎনা নিয়ে।
একটি জাতিগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়ে তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য  একটি মূল উপাদান। যেভাবেই হোক মঙ্গল  শোভাযাত্রা নামেই ডাকুন আর আনন্দ শোভাযাত্রা নামেই ডাকুন অথবা বৈশাখী শোভাযাত্রা নামেই পালন করুন  না কেন মূল বিষয়ের কোন হেরফের হয়না। বরং বারবার নাম পরিবর্তন এর মধ্য দিয়ে নিজেদের  আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরী হয়। বরং রাষ্ট্রের ঊচিত ছিল ধর্মীয় বিভাজন ও রাজনৈতিক বিভেদ উসকে না দিয়ে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কে বেগবান করা।
লেখক – সাংবাদিক ,,কলামিষ্ট

Related Posts

সর্বশেষ খবর

অন্যান্য ক্যাটাগরি