
সাঈম চৌধুরী –
আমরা বড় হয়েছি আশ্চর্য এক মধুময় সময়ে। আমাদের কৈশোরে, তারুণ্যে কবিতার ছিলো জয় জয়কার। চারপাশ ছিলো প্রবল ছন্দময়। এমনকি ঘরের দেয়ালেও ছিল কবিতার কারুকাজ। মায়ের হাতে, বোনের হাতে ফুল তোলা রুমালের ফ্রেম শোভা পেতো বসার ঘরের দেয়ালে। তাতে ছন্দছড়ার আকুতি
গাছটি হলো সবুজ বন্ধু, ফুলটি হলো লাল
তোমার আমার ভালবাসা থাকবে চিরকাল।
ঘরের দেয়াল থেকে কলেজের দেয়াল, সেখানে কী অসাধারণ কাব্যে দ্রোহ বিদ্রোহ। আজও রক্ত টগবগ করে সেই দেয়াল লিখনে, বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেলিন।
বাসায় প্রতিদিন যে ভিক্ষুক এসে হাজির হতেন, তার কণ্ঠেও থাকতো ছন্দমালা।
একটা টেকা দিয়া যান, আমি গরীব ইনসান, আখেরাতে সোয়াব পাইবেন পাহাড়ও সমান।
আমাদের বেদেনিরা পোক খোয়াই, জোঁক খোয়াই, সিঙ্গা লাগাই বলে উচ্চ কণ্ঠে তাদের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন।
আমাদের ফুটপাতের দোকানদার “দেইখ্যা নেন, বাইছা নেন, যা নিবেন তা দশ টাকা” এই ছন্দে সুরে ক্রেতাকে কাছে টেনেছেন।
বলেন দেখি, কোথায় ছন্দ, কোথায় সুর ছিল না? রাতে ঘুমাতে যাবার আগে মায়ের ঘুম পাড়ানি গান, ভোরে ঘুম ভাঙ্গার পর বাবার সুললিত কন্ঠে কোরআন তেলাওয়াত।
“ফাবি আইয়ে আলা রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান…
সকালে মক্তবে মক্তবে ছন্দ সুরের ফোয়ারা, “আলিফ খালি, বা এর ওপর এক নকতা।” দুপুরে ফেরিওয়ালা, “লেইস ফিতা লেইস…”অদ্ভুত সুন্দর সেই সুরে বুকের ভেতরে তীব্র উতাল পাতাল ।
বিকেলে খেলার মাঠ।
কানা মাছি ভোঁ ভোঁ
যারে পাবি তারে ছো,
কাবাডি খেলায় হেরে যাওয়া দলের সর্বশেষ খেলোয়াড়রের মরণপণ আওয়াজ,
মরার ডাক লইয়া আইছি
মায়ের দুধ খাইয়া আইছি
সন্ধ্যার পর পড়ার টেবিলে আবার সেই কবিতার সুর
বাদশাহ আলমগীর-
কুমারে তাঁহার পড়াইত এক মৌলভী দিল্লীর।
আমাদের প্রতিবাদ, আমাদের প্রতিরোধ অস্ত্রে নয়, হিংসায় নয়, ঘৃণায় নয়। হতো কাব্যে স্লোগানে স্লোগানে। আমরা বলতাম
লড়াই লড়াই লড়াই চাই
লড়াই করে বাঁচতে চাই..
এক দফা এক দাবি
এরশাদ তুই কবে যাবি।
আহা সেই নব্বই দশক। মাথার ওপর আকাশ হয়ে শামসুর রহমান, আল মাহমুদ, রফিক আজাদ, সৈয়দ হক, হেলাল হাফিজ, যার যৌবন মিছিলে যাবার শ্রেষ্ঠ সময় এবং রৌদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ নামের ঝলমলে রৌদ্দুর।
আমরা বন্ধুরা সেই সোনালী সময়ের সারথী। ঐ সময়ে কবি কবি চেহারা কাঁধেতে ঝোলানো ব্যাগ, এমন কবির সংখ্যা ছিলো অগণিত। তখন বলা হতো কাকের চেয়ে কবি বেশি। কথাটা অবমাননাকর হলেও কবিসংখ্যার এই বিপুলতা মোটেও খাটো করে দেখার নয়। মানুষের সুকুমার বৃত্তির চর্চা কত প্রবল ছিলো এই উপহাসটি যেনো তারই গৌরব বহন করে।
ঐ সময়ে কবিতা এত পরাক্রমশালী ছিলো যে জাঁদরেল রাষ্ট্রনায়ককেও ধার কর্জ করে কবিতা লেখার ভান করতে হতো। যদিও একজন প্রকৃত কবি তাতে ক্ষেপে গিয়ে বলেন,
“সব শালা কবি হবে, পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে উড়বেই..”
আমরা কৈশোরে ঐ কবিতাটি শুনেছি বটে কিন্তু সেটি আমাদের কবি হওয়ার অদম্য ইচ্ছায় প্রভাব ফেলে না। বরং সত্যিকার পিঁপড়া হয়েও ছিলো বুক ভরা উড়ার খায়েশ। স্কুলের প্রতিটি ক্লাসে নিদেনপক্ষে তিনজন কবি। তাঁরা শান্তশিষ্ট। তাদের কবিতায় স্কুল বার্ষিকী। তাদের কবিতায় দেয়াল পত্রিকা। এইসব কবিদের অবশ্য আরও একটা গোপন কাজ ছিলো, ক্লাশের ত্যাদর ছেলেদের হয়ে প্রেমপত্রগুলো লিখে দিতে হতো তাদেরই।
কবিতা তো এখন অনেক দূরে চলে গেছে। আল মাহমুদের কাছ থেকে ধার করে বলি,
“কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি
সে তো ভেসে ওঠা ম্লান আমার মায়ের মুখ;
নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি
পাতার আগুন ঘিরে রাতজাগা ভাই-বোন
আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘন্টাধ্বনি…
রাবেয়া রাবেয়া–
আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট!
…কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।”
বন্ধু ফয়েজুর রহমান ফয়েজ আমাদের বন্ধুমহলকে আবার কবিতার কাছে নিয়ে গেলেন। কিশোর প্রেমে কোনো এক চুল খোলা আয়েশা আক্তারের স্মৃতি ফিরিয়ে দিলেন। তিনি জানান দিলেন, কবিতা হারিয়ে যাবার নয়। তিনি জানান দিলেন,
“আলু বেচো, ছোলা বেচো, বেচো বাখরখানি
বেচো না বেচো না বন্ধু তোমার চোখের মণি
ঘরদোর বেচো ইচ্ছে হলে, করবো নাকো মানা…
হাতের কলম জনম দুখী, তাকে বেচো না।”
জনমদুখী সেই হাতের কলমকে ফয়েজ হাতে রেখেছেন নব্বই দশক থেকে। এর মাঝে কত কী বদল হলো, তারে তারে পাখি, মানুষ কবরে গেল, মিছিলে জোনাকি। তবুও তোমার মন, ছাদে ওঠা রোদ…
ফয়েজের কবিতা আমাদের মনের ছাদে ঝলমলে রোদের আনাগোনা।
তরুণ বয়স থেকেই ফয়েজ কবি। রাজনীতিও করতেন। বেশ নামডাক। বলতে গেলে, এক নামে সবাই চিনে।
কবিতা লিখতেন বলে ফয়েজ শান্তকোমল ছিলেন এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। তাকে দিয়ে প্রেমপত্র লিখিয়ে নেবে এমন দুঃসাহস ছিলো না তল্লাটে। বরং ফয়েজ নিজেই ছিলেন সাহসে সমুজ্জ্বল। মিছিলের প্রথম কাতারের মুখ। আদর্শে অটল। তার আদর্শের নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
কবিতায় প্রিয় সেই মানুষটিকে খুঁজে পাওয়া দেখি তার এই কাব্যগ্রন্থে।
“তবু তোমাকে পাই নিশিদিন রেখে যাওয়া তোমার সবুজ-শ্যামল সোনার বাংলার কৃষক-শ্রমিক-মজুর আর খেটেখাওয়া কোটি মানুষের ভিড়ে।
কালো পাইপ, কালো চশমা সেই চোখ, সেই মুখ সেই চিরচেনা
তর্জনী উঁচু করা মুজিব।”
আগেই বলেছি, তারুণ্যে কবিতা এবং মানুষের জন্য রাজনীতির স্বপ্ন ধারণ করে পথ হেঁটেছেন ফয়েজ। ঐ সময়ে চলনে বলনে তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর কাব্যের কৃষক। প্রকৃতই কবি কবি চেহারা। সিলেট শহর, কিনব্রিজের এপার ওপার জানতো, ফয়েজ নামের কবির ঠিকুজি। তার কাব্য সম্ভাবনা নিয়ে উঠতি কবিদের চায়ের কাপে আলাপ জমতো। আগ্রহ নিয়ে তার কবিতার দিকে তাকাতেন বোদ্ধামহল।
আমরা দেখতে পাই, আমাদের শহরের অলিতে গলিতে ফয়েজ কবিতাকে খুঁজেন হন্তদন্ত হয়ে। কবিতায় বলেন তিনি
“আমাকে তেমন-একটি কবিতা দাও
যার প্রেমজ হৃদয়ের মাধুরী দিয়ে রাঙিয়ে দেবে কবির হৃদয়।
যার কাছে নেব আমি ইতিহাসের আদিঅন্ত পাঠ
যার কাছে রেখে যাব আমার যোগ্য উত্তরাধিকার।”
আমাদের ফয়েজ কবিতা এবং রাজনীতি দুটোতেই সম্ভাবনার জানান দিচ্ছিলেন। তারুণ্যকে তিনি রঙিলা নাওয়ের সওয়ার করে তরতর বৈঠা বেয়ে দূরে যাবার পথও পেয়েছিলেন।
স্বভাবে ফয়েজ স্পষ্টভাষী। রাগও প্রবল। আদর্শে আপোস জানেন না। প্রয়োজনে কথা বলেন কাঁটা কাঁটা।
বোধকরি এই যে, একরোখা স্বভাব কিংবা অসুন্দরকে রুখে দেবার চেষ্টা সেটা তার কাব্য অভিযাত্রাকে খানিক জটিল করে তুলেছিলো। তবুও ফয়েজ তো ফয়েজই। আমাদের বন্ধু ভাঙে কিন্তু মচকায় না।
জীবনের প্রয়োজনে ফয়েজ দেশ ছেড়েছেন।
তবু তিনি কবিতাকে ছাড়েন নি।
নব্বই দশকের মধ্যভাগে ঝাকড়া চুলের বাবরি দুলিয়ে যে তরুণ কবিতায় বসত নিয়েছিলেন, আজ তিনি অতিক্রম করছেন জীবনের মধ্যভাগ।
“আজকে যে চুল রাখে বাবরি
লুকোবে চাঁদির টাক কাল সে
কি করে লুকোবে তার চশমা
চল্লিশ পেরোলেই চালশে…”
ফয়েজ চল্লিশ পেরিয়েছেন বছর পাঁচেক আগেই। ফয়েজও চালশে হয়েছেন। এই সময়ে অনেক কিছু হাতের মুঠো ফসকে বেরিয়ে গেছে। তবু তার বুক পকেটে আজও কবিতা। কোনো কোনো রাতে সেই কবিতাগুলো জোনাকি হয়ে জ্বলে। জোনাকির সেই রূপালী আলোয় আমরা আলোকিত হই।
জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।
আমাদের ফয়েজ সেই কেউ কেউ এর একজন।





