Brick Lane News

সুমনের জন্য শোকগাঁথা –

সাঈম চৌধুরী –

কায়সারুল ইসলাম সুমনের ছিলো দীর্ঘ কথা এবং অল্প আয়ুর জীবন। ফোনের শুরুতে নিশ্চিত করতেন, কথা বেশি দীর্ঘ হবে না। তাঁর এমন আশ্বাসে আমি অবশ্য খুব একটা নিশ্চিত হতে পারতাম না।
একটা গল্প বলি, সেদিন ঘরে আমি একা। রান্না করার জন্য মাংস কিনে এনেছি। পেঁয়াজ কাটছি, এমন সময় এলো সুমন ভাইয়ের ফোন।‌ আমি পেঁয়াজ কাটলাম, রসুন কাটলাম, আদা কাটলাম। দোকানদার খুব সম্ভবত বুড়ো টাইপের গরুর মাংস দিয়েছিলো। সিদ্ধ হয় না। সুমন ভাইয়ের গল্পও শেষ হয় না। আমি বলি, ভাই মাংস তো সিদ্ধ হয় না। তিনি বলেন, রান্নায় একটা সুপারি দিয়ে দেন, মাংসের বাপ সিদ্ধ হবে। কথামতো দিলাম সুপারি। মাংস সিদ্ধ হয় না। সুমন ভাইয়ের গল্পও শেষ হয় না। বলি, ভাই সুপারিতে তো কাজ হচ্ছে না, ঘরে পান এবং হাকিমপুরী জর্দা আছে রান্নায় সেটাও দেবো নাকি?
সুমন ভাই হো হো করে হাসেন।
সেদিন প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার রান্নার পুরোটা সময়জুড়ে কায়সারুল ইসলাম সুমন ফোনে কথা বলেছেন।
কিসের এত কথা? দেশের কথা, দশের কথা, হাসির কথা, খোঁচার কথা। অনর্গল কথা বলেন তিনি। তার ছিলো দীর্ঘ কথা আর অল্প আয়ূর জীবন।
এক রাতে তিনি আমার বাসায় থাকলেন। বললেন, কাল সকাল সকাল চলে যেতে হবে, রাতে বেশি কথা বলা যাবে না।
আমি বললাম, অবশ্যই।
তিনি বললেন, আসুন একটু সময় গল্প করি।
আমি বললাম, ঠিক আছে।
সেই একটু সময়ের গল্প রাত বারোটার দিকে শুরু হয়ে, শেষ হয় ভোর ছয়টায়। মূল কথক সুমন ভাই। শ্রোতা আমি এবং আমিনা।
কিসের এত গল্পকথা?
খুব যে জরুরি এমনটা নয়। কথাগুলো নিত্য দিনের পাঁচালি। সুমন কথা বলেন গুছিয়ে। শুনতে ভালো লাগে। গল্পের মাঝে শরীর দুলিয়ে হাসেন। দেখতে ভালো লাগে। রাখডাক ছাড়াই কাঁটা কাঁটা মন্তব্য করেন। কেমন নতুন নতুন লাগে।
সবার মতো করে গল্প নয়, কায়সারুল ইসলাম সুমন গল্প করেন একদম তার নিজের মতো করে। ব্যবসায়িক ভাষায় যাকে বলে ট্রেডমার্ক, সুমন ভাইয়ের কথাগুলো ঠিক তেমনি তার নিজের ট্রেডমার্ক হয়ে ছিলো। এমন গল্প এবং গল্প বলার মানুষ এক জীবনে আমি আর কোনোদিন কোথাও খুঁজে পাবো না।
ভোরবেলা যাবার সময় সুমন ভাই আমার দুই মেয়ের হাতে কিছু পাউন্ড তুলে দেন।‌ সাত বছর বয়সি ছোট মেয়ে নগদ পেয়ে খুব খুশি। দু’দিন পরে পরে জানতে চায়, সুমন আঙ্কেল আবার কবে আসবেন?
আমিও জিজ্ঞেস করি, আবার কবে আসবেন সুমন ভাই?
তিনি বলেন, সময় পেলে আরও কিছু রাত আপনাদের সাথে কাটাবো। কবি দিলওয়ার হোসেন মঞ্জুকে নিয়ে কথা বলবো, হাসান হাফিজ পলক ভাইকে নিয়ে কথা বলবো।
আমি বলি, অবশ্যই আরও কিছু রাত আমাদের গল্প হয়ে আসবে।
আমাদের সেই গল্পের রাত আর কোনো দিন আসবে না। গল্প বলা মানুষটাই এখন নিজেই গল্প হয়ে গেলেন।
এই কিছুদিন আগে আমি যখন প্রেস ক্লাবের নির্বাচনের অংশ নেয়ার চিন্তাভাবনা করছি একদিন পরামর্শের জন্য সুমন ভাইকে কল দিলাম। বললাম,‌ সুমন ভাই, আমি প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের কথা ভাবছি। আপনি কি বলেন?
সুমন ভাই এক বাক্যে বলেন, আপনি ধুমাধুম ফেইল!
এমন বেয়াড়া জবাব আশা করি নি। তাই একটু দম ধরি। সুমন বলেন, পাশ ফেইল যাই হোক, আছি আপনার সাথে।
আসলেই তিনি ছিলেন। আমার সাথে ছিলেন। আমার পাশে ছিলেন। কেবল নির্বাচনের সময় নয়, সব সময় তাকে কাছে পেয়েছি। কখনো ভাই , কখনো বন্ধু, কখনো সহকর্মী । সব ভূমিকায় তিনি ছিলেন অতুলনীয়, অনন্য। কায়সারুল ইসলাম সুমন দশজনের একজন নন, তিনি ছিলেন দশজনকে ছাড়িয়ে যাওয়া একজন।
কথায় আছে, মৃত মানুষের দোষ কোনো খুঁজতে নেই, আমি তো জীবিত কায়সারুল ইসলাম সুমনের কোনো দোষ খুঁজে পাই না। আর তাই এখন কেবল শূন্যতাকে পাই। বুকের গভীর থেকে একটা কান্না দলা পাকিয়ে গলার কাছে আসে। আহা! জীবন এতো ছোট কেনে?

সুমন ভাই, “তুমি ঘুমিয়ে পড়েছো, আর আমি সারা পাড়ার রাত একসাথে জড়ো করে তোমার অভাব শোনাচ্ছি, যাওয়ার আগে যদি এই অভাব টুকু তুমি নিয়ে যেতে”…

Related Posts

Social Media

সর্বশেষ খবর