Brick Lane News

ঘৃণার রাজনীতি ও ভাঙা সহাবস্থান

এফ এম শাহীন-

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ ঘৃণা ও হিংসা আর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়—এগুলো পরিকল্পিতভাবে ব্যবহৃত হাতিয়ার। প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা রাষ্ট্র ও সমাজ—উভয় স্তরেই গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে। শত্রুকে মানুষ ভাবা বন্ধ হয়ে গেলে তাকে দমন করা ন্যায্য বলে মনে হয়—এটাই ঘৃণার রাজনীতির মূল সূত্র।

আজ আমরা যে সময় পার করছি, তা নিছক রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নয়; এটি সামাজিক সহাবস্থানের সংকট। গ্রাম থেকে শহর, রাজপথ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব জায়গাতেই ঘৃণা উৎপাদন করা হচ্ছে, বিতরণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে সহাবস্থান “ব্যর্থ” হয়নি; বরং একে সচেতনভাবে অচল করে দেওয়া হয়েছে।

সহাবস্থান টিকে থাকে তিনটি মৌলিক ভিত্তির ওপর—বিশ্বাস, ন্যূনতম নৈতিকতা এবং ক্ষমতার সীমা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশ-এর রাজনীতিতে এই তিনটি ভিত্তিই পদ্ধতিগতভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক মতভেদ আর আদর্শিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই; তা পরিণত হয়েছে অস্তিত্বের সংঘাতে। এর অনিবার্য ফল—সংলাপের জায়গা সংকুচিত হওয়া এবং হিংসার স্বাভাবিকীকরণ।

এই প্রেক্ষাপটে প্রায়ই বলা হয়, “মহান রাজনীতিবিদরা” চাইলেও সহাবস্থানে আসতে পারছেন না। কিন্তু প্রশ্নটি আরও নির্মম হওয়া প্রয়োজন—তারা কি আদৌ আসতে চাইছেন? নাকি বাস্তব ক্ষমতার নিয়ন্ত্রকেরা তাদের সেই সুযোগ দিচ্ছে না? বাস্তবতা হলো, আজ মাঠের রাজনীতিবিদরা আর চূড়ান্ত ক্ষমতার কেন্দ্র নন। সিদ্ধান্তের বড় অংশই গৃহীত হচ্ছে রাজনৈতিক পরিসরের বাইরে।

ঘৃণার এই রাজনীতি কোনো একক গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র—এমন ধারণা বাস্তবতাকে সরলীকরণ করে। বরং এটি একটি সম্পূর্ণ ক্ষমতার ইকোসিস্টেম। অস্থিতিশীলতা নিরাপত্তা কাঠামোর কাছে “স্থিতিশীলতা ব্যবস্থাপনা”-র যুক্তি তৈরি করে। আমলাতন্ত্র রাজনৈতিক সংঘাতে নিজেকে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করে বাস্তব ক্ষমতা ধরে রাখে। বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী সংঘাতের ভেতরেই খুঁজে পায় টেন্ডার, একচেটিয়া সুবিধা ও দায়মুক্তির সুযোগ। অন্যদিকে বিদেশি স্বার্থ গণতন্ত্রের চেয়ে বেশি আগ্রহী “প্রেডিক্টেবল শাসক”-এ—কারণ বিভক্ত ও ঘৃণায় জর্জরিত জনগণ প্রশ্ন করতে পারে না।

ইতিহাস এই বাস্তবতার সাক্ষী। রাজনীতিতে যখন ঘৃণা ও হিংসা কৌশলে পরিণত হয়, তখন তা কখনোই দুর্ঘটনা নয়; এটি ক্ষমতা ধরে রাখার পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। নাৎসি জার্মানিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘৃণা উৎপাদনের ফল ছিল গণহত্যা ও ধ্বংস। রুয়ান্ডায় রাজনৈতিক ক্ষমতা রক্ষার নামে উসকানো ঘৃণা একশ দিনে আট লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের ইতিহাস দেখায়, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কীভাবে বারবার অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থানের পথ তৈরি করেছে—আর তার মূল্য দিয়েছে সাধারণ মানুষ।

তবে ইতিহাস কেবল অন্ধকারের নয়; বিকল্প পথেরও উদাহরণ আছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনের অবসানের পর দেশটি চাইলে প্রতিশোধের রাজনীতিতে যেতে পারত। কিন্তু সহাবস্থান ও সত্যের রাজনীতি বেছে নেওয়ায় রাষ্ট্র ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।

এই সব উদাহরণ একটি কঠিন সত্য সামনে আনে—ঘৃণা কখনো স্বতঃস্ফূর্ত নয়। এটি রাজনৈতিকভাবে উৎপাদিত, ব্যবস্থাপিত ও ব্যবহৃত হয়। সহাবস্থান ভেঙে পড়লে লাভবান হয় সেই শক্তিগুলো, যারা গণতন্ত্র নয়, নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেয়। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা তাই কোনো ব্যতিক্রম নয়; এটি ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতা।

প্রশ্ন একটাই—এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া হবে, নাকি আবারও একই মূল্য দিতে হবে?

— এফ এম শাহীন
লেখক, সংগঠক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

Related Posts

Social Media

সর্বশেষ খবর